সন্তানের লাশ পুড়িয়ে নিউইয়র্কে বিতর্কের ঝড় তুললেন লেখিকা মিনা ফারাহ
বর্ণমালা নিউজ, নিউইয়র্ক থেকেঃ নিউইয়র্কের বিতর্কিত ব্যবসায়ী-লেখিকা মিনা ফারাহ ওরফে মিনা রানী সাহা সড়ক দূর্ঘটনায় আহত হয়ে মৃত্যুবরণকারী তার বড় ছেলে সাফায়েত রেজার মৃত দেহ দাফন করার পরিবর্তে হিন্দু রীতি অনুযায়ী পুড়িয়ে ফেলে নিউইয়র্কে বাংলাদেশী কমিউনিটিতে বিতর্কের ঝড় তুলেছেন। এই ঘটনায় বাংলাদেশী মুসলমানদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। তার এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে গতকাল শুক্রবার জুমমার নামাজ শেষে নিউইয়র্কের বাংলাদেশী বিভিন্ন মসজিদে তীব্র নিন্দা প্রকাশ করা হয়। সন্ধ্যায় জ্যাকসন হাইটসে ভলেন্টিয়ার এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ আয়োজিত প্রতিবাদ সভায় একজন মুসলমানের মৃতদেহ পুড়িয়ে ফেলে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার দায়ে তাকে অভিযুক্ত করে মামলা করা যায় কিনা তা খতিয়ে দেখার আহ্বান জানান বক্তারা। সভা থেকে সামাজিকভাবে মিনা ফারাহকে বর্জন ও জ্যাকসন হাইটসে অবস্থিত তার মালিকানাধীন মার্কেট বাংলাদেশ প্লাজা ও অন্যান্য ভবন সমূহ বয়কটের আহ্বান জানানো হয়। প্রতিবাতদ সভা শেষে বাংলাদেশ প্লাজার সামনে তাৎক্ষণিক স্বতস্ফুর্ত বিক্ষোভ সমাবেশে মিনা ফারাহর কৃত কর্মের জন্য প্রতিদিন প্রতিকী সমাবেশের মাধ্যমে তার প্রতি ক্রমাগত ঘৃণা প্রকাশের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়।
গত ২ সেপ্টেম্বর লং আইল্যান্ডের স্টোনিব্রুক ইউনিভার্সিটিতে ইফতার পার্টিতে অংশ নিয়ে বাড়ী ফেরার পথে গাড়ীর নিয়ন্ত্রন হারিয়ে দূর্ঘটনায় পতিত হয়ে মারাত্মক আহত হয়ে মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ে গত ১০ সেপ্টেম্বর সাফায়েত রেজা শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। সড়ক দূর্টনায় সাফায়েত রেজার আহত হবার ঘটনাটি নিউইয়র্কের মূলধারা দৈনিকগুলোতে প্রকাশিত হয়, কিন্তু তা পুত্রের দূর্ঘটনার সংবাদ বাংলা সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশ না করার জন্য অনুরোধ করেন তিনি। ১০ সেপ্টেম্বর তার সন্তানের মৃত্যুর সংবাদ জানার পর কমিউনিটিতে শোকের ছায়া নেমে আসে। মেধাবী ছাত্র সাফায়েতের অকাল মৃত্যুতে তার মা মিনা ফারাহ ও পিতা ফরহাদ রেজার প্রতি সমবেদনা জানাতে কমিউনিটির সর্বস্তরের মানুষ তাদের রীচমন্ড হীলের বাসায় যান। এদিকে সাফায়েত মুত্যুর পর পরই কমিউনিটিতে ছড়িয়ে পরে যে মিনা ফারাহ তার পুত্র সাফয়েতকে হিন্দু ধর্মানুসারে সৎকার করবেন। প্রথমে অনেকেই তা বিশ্বাস করেননি। কারন সাফায়েতের বাবা ফরহাদ রেজার সাথে বিয়ের সময়ে ধর্মান্তরিত হয়ে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হয়ে মিনা রানী সাহা নাম পরিবর্তন করে মিনা ফারাহ নাম ধারন করেছেন এটা সবাই জানতেন। যদিও এক সময়ে মিনা ফারাহ দাবী করেছেন যে তিনি কোন ধর্ম পারন করেন না। অন্য দিকে সাফায়েত ও তার ছোট ভাইকে অর্থাৎ দুই পুত্রকে মিনা ও ফরহাদ দম্পত্তি ইসলামী শিক্ষাদান করেছেন। তারা জ্যামাইকা মুসলিম সেন্টারে কোরান শিক্ষা ক্লাসে অংশ নিয়েছেন। এছাড়া জ্যামাইকা মুসলিম সেন্টার সহ অন্য মসজিদেও সাফায়েত নামাজ আদায় করেছেন এটা অনেকেই প্রত্যক্ষ করেছেন। ফলে স্বাভাবিক নিয়মেই সবাই ধরে নিয়েছিলেন একজন মুসলমান হিসাবে সাফায়েতকে দাফন করা হবে। কিন্তু মিনা ফারাহ তার সিদ্ধান্তে অনড় থাকলে কমিউনিটির নেতৃবৃন্দ পৃথক ভাবে এবং সমিমলিতভাবে তাকে অনুরোধ করেন সাফায়েত ইসলামী রীতিতে সমাহিত করার। এক্ষেত্রে জ্যাকসন হাইটস বাংলাদেশী বিজনেস এসোসিয়েশন (জেবিবিএ)’র কার্যকরী কমিটির নেতৃবৃন্দও তাকে অনুরোধ করেন তার পুত্রকে জানাজা পরিয়ে দাফন করতে। মিনা ফারাহও জেবিবিএ’র সক্রিয় সদস্য। সবার অনুরোধ এবং অনেকটা চাপে নতি স্বীকার করে মিনা ফারাহ জানাজা পরাতে সমমত হন, কিন্তু দাফনের পরিবর্তে ছেলের মৃতদেহ পুড়িয়ে ফেলার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেননি। শুক্রবার সকাল সাড়ে আটটায় তার বাড়ীর কাছের একটি মসজিদে তড়িঘড়ি করে নামাজে জানাজা আয়োজন করে কঠোর পুলিশী পাহারায় সাফয়েতের মৃতদেহ নিয়ে যাওয়া হয় এশটি সেমিট্রিতে। সেখানে মৃতদেহ রেখে চলে আসেন তারা। তা পুড়ানোর সময় মিনা ফারাহ বা পরিবারের কেউ উপস্থিত ছিলেন না।
ভলেন্টিয়ার এসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ আয়োজিত প্রতিবাদ সভায় একজন বক্তা বলেছেন, ছেলের মৃতদেহ পুড়ানোর ঘটনার মাধ্যমে মুসলমানদের ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার আগে কয়েক বছর আগে নিউইয়র্ক সিটির পাবলিক স্কুলে ঈদের দিন মুসলমান শিক্ষাথীদের ছুটি নিশ্চিত করার বিষয়ে উদ্যোগ গ্রহনকারী স্টেট সিনেটর জন সাবিনীর সাথে দেখা করে মিনা ফারাহ তাকে ভৎসনা করে বলেছিলেন এটি করে তিনি কেন মুসলিম টেররিস্টদের উৎসাহিত করছেন? এছাড়া বর্তমান তত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতা গ্রহনের পর পরই তিনি সরকারে সমর্থনে তার বাংলাদেশ প্লাজায় সমাবেশ করে ঢাকায় সেনা প্রধান মইন উ আহমেদের সাথে তার সাক্ষাতের বর্ণনা দেন এবং দুই নেত্রী শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে বিষোদগার মূলক বক্তব্য রাখেন। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন স্থানে প্রকাশ্যে দুই নেত্রীর বিরুদ্ধে অসৌজন্যমূলক শব্দ প্রয়োগ করে বাহবা কুড়ানোর চেষ্ঠা করেও কোন সাড়া পাননি। আবার গত মাসে ভার্জিনিয়া গিয়ে শেখ হাসিনাকে তার লেখা বিতর্কিত গ্রন্থ ’হিটলার থেকে জিয়া’ উপহার দিয়ে সে সংবাদ ফলাও করে প্রচারে প্রচুর পরিশ্রম করেছেন। কিছুদিন আগে খালেদা জিয়ার মুক্তির বিরোধীতা করে তার মালিকানাধীন বাংলাদেশ প্লাজার সামনে একাই কালো পতাকা নিয়ে প্রতিবাদ করেছেন।
সূত্রঃ এনওয়াই নিউইয়র্ক।
Evergreen Bangla Community
সুব্রত বিশ্বাস : মৃত ব্যক্তির মরদেহ নিয়ে ধর্মীয় উন্মাদনার নেপথ্যে
মৃত ব্যক্তির লাশ নিয়ে সুযোগ সন্ধানী ও ধর্ম ব্যবসায়ীদের রাজনৈতিক ব্যবসা ভালোই জমে উঠেছে। দন্ত চিকিৎসক মিসেস মিনা ফারাহ’র জৈষ্ঠ্য পুত্র শাফায়েত রেজা গুরুতর গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা গেছে। আর তার শেষকৃত্যকে কেন্দ্র করেই ধমীয় উন্মাদনা এবং রাজনৈতিক ব্যবসার উৎপত্তি।
মিনা ফারাহ’র স্বামী ফরহাদ রেজা একজন মুসলিম। মিনা ফারাহও ধর্মান্তরিত মুসলিম বলে শুনে এসেছি। পুনরায় মিনা ফারাহ পূর্বের ধর্ম অর্থাৎ হিন্দু ধর্মে ফিরে গেছেন সেটা শুনিনি। জানার কথাও নয়, কেননা বিষয়টি তার ব্যক্তিগত। সম্প্রতি ঘটনার প্রেক্ষিতে স্বামী-স্ত্রী সাংবাদিক সমেমলনে বলেছেন, তাদের পরিবার হিন্দু ও মুসলিম ধর্মের সমন্বিত একটি পরিবার। এবং তাদের ছেলেমেয়েরা ধর্মতঃ অর্ধেক হিন্দু ও অর্ধেক মুসলিম। এ বক্তব্য যদি স্ত্রী তথা মিসেস মিনা ফারাহ’র হিন্দু ধর্ম প্রমাণের উদ্দেশ্যে হয়ে থাকে, তাহলে বলতে হবে মিনা ফারাহ আবার হিন্দু ধর্মে ফিরে গেছেন। অর্থাৎ তিনি এখন মিনা রাণী সাহা। যদিও কোন ধর্মত্যাগী হিন্দু পুনরায় হিন্দু ধর্মে ফিরে আসার বিধান নেই। তবে বহুক্ষেত্রে ধর্মও যে সুবিধাবাদী ভুমিকা পালন করে থাকে বলাই বাহুল্য।
এপ্রসঙ্গে আমার জানা মতে এই নিউইয়র্কে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের অনেক পরিবার আছে যারা স্বামী-স্ত্রী ভিন্ন ধর্মাবলম্বী এবং কেহই ধর্মান্তরিত না হয়ে একত্রে জীবন যাপন করছেন। মিসেস মিনা ফারাহ ও ফরহাদ রেজা সেধরনের একটি পরিবার এবং তাদের ছেলেমেয়েরা সেভাবেই গড়ে উঠ্ছে কিনা জানিনা। তবে তর্কের খাতিরে যদি ধরে নেই মিনা ফারাহ ধর্মান্তরিত অবস্থায়ই আছেন। সেক্ষেত্রেও যে কথাটি সত্য সেটা হলো, ব্যাপারটা তাঁর এবং তাঁদের একান্ত ব্যক্তিগত। তেমনি ধর্মটাও। কারণ যেহেতু ধর্মে ধর্মান্তরিত হওয়ার বিধান প্রচলিত রয়েছে, সেহেতু পুনরায় কোন ব্যক্তির ধর্ম ত্যাগ বা পছন্দ-অপছন্দও যৌক্তিকতার বিবেচনায় একান্ত ব্যক্তিগত। অবশ্য ধর্মান্ধ বা ধর্ম ব্যবসায়ীদের অভিমত বরাবরই উল্টো।
সুতরাং তাদের ছেলের মৃতদেহ দাহ না কবর দেয়া হবে সেটা তাদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ব্যাপার। এক্ষেত্রে ছেলের মৃতদেহের জানাজা বা কবর দেওয়া নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি বা তাদের ব্যক্তিগত অধিকারের ওপর চড়াও হওয়া অনধিকার হস্তক্ষেপের সামিল। কারণ ছেলেমেয়ের প্রতি যেকোন পিতামাতার স্নেহ-মমতা, ভালমন্দ কোন তৃতীয় পক্ষের চেয়ে সকল সময়ই বেশি বৈ কম নয়। তথাপি তর্কের খাতিরে যদি ধরে নেয়া হয় মিনা ফারাহ ছেলের মৃতদেহ দাহ করে অন্যায় করেছেন। কিন্তু সেজন্য তার মুসলমান স্বামীকে কিন্তু কোন প্রতিবাদ করতে দেখা যায়নি। তাছাড়া সাংবাদিক সমেমলনেও উভয়ের বক্তব্যে তেমন কোন ইঙ্গিত নেই। সুতরাং ছেলের জানাজা, কবর, দাহ যাকিছু হয়েছে সবই উভয়ের মধ্যে সমঝোতার ভিত্তিতেই হয়েছে একথা ধরে নেওয়ার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে।
অনেকে মন্তব্য করেছেন, জানাজার পর দাহ করার ঘটনা পৃথিবীতে এই প্রথম। প্রথম কিনা জানিনা তবে অতীতের অনেক ঘটনা আছে এই ঘটনার সাথে যথার্থভাবে সঙ্গতিপূর্ণ। জনাব আহমদ শরীফ ও ওয়াহিদুল হক ছিলেন বাংলাদেশের দুজন শিক্ষিত ও জ্ঞানী-গুণী ব্যক্তি। জন্মগতভাবে মুসলমান এবং সামাজিকভাবে প্রতিষ্ঠিত। আহমদ শরীফের মৃত্যুর পর তার ইচ্ছানুসারে জানাযা না করে মরদেহ হাসপাতালে দান করা হয়। আর ওয়াহিদুল হকের মৃত্যুর পর যথারীতি ধর্মীয় বিধান মতে নামাযে জানাযার পর একইভাবে চিকিৎসা বিজ্ঞানের কাজে ব্যবহারের জন্য হাসপাতালে দান করে দেয়া হয়। এ দু’টি ব্যাপারই কিন্তু ধর্মীয় বিধানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অথচ এনিয়ে কোন হৈ চৈ শোনা যায়নি। এই নিউইয়র্কে নিয়মিত নামায-রোজা আদায় করেন, সামাজিকভাবেও প্রতিষ্ঠিত, এমন বিশিষ্ট ব্যক্তির ছেলের সাথে জনৈকা হিন্দু মেয়ের বিবাহ অনুষ্ঠান একবার হিন্দু মতে আবার মুসলিম মতে অনুষ্ঠিত হয়। কেউ কারো ধর্ম পরিবর্তন করেছেন বলে শুনিনি। অনুষ্ঠানে নিউইয়র্কের গণ্যমান্য অনেকেই উপস্থিত ছিলেন। এনিয়ে কারো কোন বিরূপ মন্তব্য কিংবা ধর্মীয় উন্মাদনাও লক্ষ্য করা যায়নি।
পৃথিবীর বিভিন্ন মুসলিম দেশে গুলি, বোমা, গ্রেনেড এবং সন্ত্রাসী হামলায় একই ধর্মের অনুসারী হওয়া সত্বে কেবলমাত্র ভিন্ন মতের প্রতিহিংসায় প্রতিদিন নারী-পুরুষ ও শিশু প্রাণ হারাচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের সময় সাম্প্রদায়িক জামাত ও হানাদার বাহিনী বাঙালীদের হত্যা করে বেহিসাব হিন্দু-মুসলমানকে একত্রে গণকবর দেওয়া হয়। বসনিয়ায় আগুনে পুড়িয়ে মারার কথা কে না জানে। মুক্তিযুদ্ধের মধ্যভাবে আমি তখন সিলেটের উত্তরে বাংলাদেশের তামাবিল ও ভারতের মেঘালয়ের বর্ডারে অবস্থান করছি। তখনকার একটি নৃশংস ঘটনার স্মৃতি আমার মুক্তিযুদ্ধের অন্যান্য স্মৃতির মধ্যে অন্যতম। ঘটনাটি ঘটেছিল তামাবিলের নিকবর্তী জাফলং বাজারের মসজিদে। পাক-বাহিনী ও জামাত মসজিদে নামাযরত মুসল্লিদের ঘেরাও করে মসজিদের দরজা জানালা বন্ধ করে আগুন লাগিয়ে দেয়। মুসল্লিরা প্রাণ বাঁচাতে দরজা জানালা ভেঙ্গে বের হতে যেয়ে গুলিতে প্রাণ হারান। সেদিনের আগুনে মসজিদ এবং মুসল্লিদের সাথে কোরআন শরীপও জ্বলেছে। যারা মসজিদে আগুন দিয়েছে, কোরআন পুড়িয়েছে তারা যেমন মুসলমান, যারা পুড়ে ছাঁই হয়েছে তারাও কিন্তু মুসলমান ছিলেন। অথচ আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া কেউই কিন্তু ধর্মীয় বিধানের সৎকার পায়নি। আর যারা আগুন দিয়েছিল, তাদের কি কিছু করা গেছে? পাক বাহিনী না হয় দেশ ছেড়ে চলে গেছে, কিন্তু জামাত তো বহাল তবিয়তে দেশেই আছে। সেসব হত্যা-ধর্ষণ, পুড়িয়ে মারার অপরাধে জামাতকে শাস্তি দেয়া যায়নি কেন? যায়নি, কারণ বিএনপি তাদের কুলে নিয়ে জাতে তুলেছে। জামাত এখন বিএনপির গলার মালা। উভয়ে একই টাকার এপিট ও ওপিট। শুধু কি তাই বিএনপির সাথে জোট বেধে জামাত ক্ষমতার অংশীদার হয়েছে।
তারপর যে কথাটি হলো, ধর্ম ও সমাজ যেহেতু পরসপর সম্পর্কিত তাই শাফায়েত রেজার মৃত্যুপরবর্তী ঘটনায় অনেকের প্রশ্ন থাকা নিতান্ত স্বাভাবিক। কিন্তু তাই বলে দুঃখজনক একটি মৃত্যুর শোকাবহ ঘটনা নিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা লুটার অপচেষ্টা অবশ্যই নিন্দনীয়। তবে সুযোগ সন্ধানীরা যে ধর্মীয় সপর্শকাতর ঘটনা ও বিষয়কে অজুহাত করে স্বাথসিদ্ধি এবং প্রতিহিংসা চরিতার্র্থ করে থাকে তার বহু উদাহরণ আছে। এ প্রসঙ্গে একটি ঘটনার উদৃতি তুলে ধরছি। বিএনপি-জামাত জোটের ক্ষমতার শেষ দিকে সিলেটের গোলাপগঞ্জ থানার ঢাকাদক্ষিণ গ্রামের জনৈক বাবুল ভৌমিক কোরআনের পাতা ছিড়ে ফেলেছেন এই অভিযোগ তুলে ধর্মীয় উন্মাদনার উত্তেজনা সৃষ্টি করে ৮/১০ গ্রামের মুসলিম সম্প্রদায় মিলিতভাবে আক্রমণ করে তার ২৯টি ঘরবাড়ী জ্বালিয়ে দেয়া হয়। নেপথ্য নায়কদের উদ্দেশ্য ছিল বাবুলের বিষয় সম্পত্তি আত্মসাৎ করা। আর সেকারণে ঘটনা ঘটানোর আগে নেপথ্যের উদ্দেশ্য বা কারণ অনুসন্ধান কিংবা সত্য মিথ্যা যাচাইয়ের সুযোগ দেয়া হয়নি। এখানেই ধর্মান্ধ, ধর্ম ব্যবসায়ী ও সুযোগ সন্ধানীদের চরিত্রগত মিল বা সম্পর্ক।
তেমনি মিসেস মিনা ফারাহ’র ছেলের ঘটনাকে কেন্দ্র করে যারা ধর্মীয় অনুভূতির কারণ দেখিয়ে প্রতিবাদী হয়েছেন তারা সত্যিকার অর্থে সহানুভূতির মন নিয়ে কিংবা ধর্মীয় ভাবাবেগে তাড়িত হয়ে এসেছেন এমনটি বলার অবকাশ আছে মনে করিনা। পত্রপত্রিকায় নাম দেখে অন্তত তেমনটি মনে করার কোন কারণ দেখিনা। কারণ মুখচেনাদের বেশির ভাগই কলঙ্কিত চারদলীয় জোটের নেতা এবং কর্মী। তাদের ধর্মীয় আবেগের নেপথ্যে প্রতিহিংসার বিশেষ উদ্দেশ্যে যে কাজ করছে বলাই বাহুল্য। উদ্দেশ্য এবং কারণটাও অত্যন্ত পরিস্কার। সেটা হলো-মিনা ফারাহ জিয়াউর রহমানের কুকীর্তি-অপকীর্তি নিয়ে সম্প্রতি একটি বই লিখেছেন। ক্ষোভটা সেখানেই। দীর্ঘদিন থেকে তারা এ ক্ষোভ লালন করে আসছেন। বিভিন্ন সময় পত্রপত্রিকা এবং সভা সমিতির মাধ্যমে তাদের সে ক্ষোভ প্রকাশ পেয়েছে। এবারের মূখ্যম সুযোগ তারা হাতছাড়া করতে নারাজ। তাই ধর্মীয় অনুভূতির অজুহাত তুলে প্রতিহিংসা চরিতার্থে মৃত ব্যক্তির লাশ নিয়ে টানা হেচড়া হচ্ছে। এটা অবশ্য তাদের নতুন ঘটনা নয়। ১/১১ এর আগের পাঁচ বছরকালে খুন-হত্যা-ধর্ষণের ঘটনাকে চাপা দিতে মিথ্যাচারের তালিম দিয়ে এসব নাটকে তারা এখন অভ্যস্ত। তারপরও মনে রাখা ভালো ব্যক্তি স্বাধীনতা আমেরিকার আইন প্রটেক্ট করে। এবং আইন তার নিজস্ব গতিতে চলে। কারো ঘরবাড়ী উড়িয়ে দেয়া, দোকানপাট বন্ধ করা কিংবা বয়কট করা অথবা উস্কানী দেওয়া সবই সম্ভব তবে সেটা সম্ভবতঃ বাংলাদেশে।
শেষ কথাটি হলো, মিসেস মিনা ফারাহ’র সব কিছুতে একমত হতে হবে এমন মনে করার কারণ নেই। তাঁর লেখা ’জিয়া থেকে হিটলার’ বইয়ে জিয়ার অংশ ছাড়া অন্যত্র কিছু ব্যাপার এবং কোন কোন অংশে ভাষা ও শব্দ প্রয়োগের ক্ষেত্রে অনেকের সাথে আমারও দ্বিমত আছে। কিন্তু তার ধর্মীয় পরিচয় বা ধর্মীয় অবস্থানকে আমি গুরুত্ব মনে করিনা। কারণ ধর্ম বিশ্বাস এবং ধর্ম পালন যার যার ব্যক্তিগত ব্যাপার বলে মনে করি। মিনা ফারাহকে সেই নব্বই এর দশকে সাঈদী, গোলাম আযম, নিজামীদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন প্রতিবাদ আন্দোলনে দেখেছি। আজো তার বিভিন্ন লেখনি সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে সেটাই আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
সূত্রঃ এনওয়াই নিউইয়র্ক।