মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশী শ্রমিকদের আত্মহত্যা

স্বপ্নের দেশ মালয়েশিয়ায় দু’চোখ ভরা স্বপ্ন নিয়ে এসে বাংলাদেশী শ্রমিকরা আত্মহত্যা করে প্রমান করে দিচ্ছে ওরা কেমন আছে। এ পর্যন্ত এবছর কমপক্ষে ৪ জন শ্রমিকের আত্মহত্যাসহ বহু মৃত্যুসংবাদ পাওয়া গেছে। যদিও এর চেয়ে বেশী শ্রমিক আত্মহত্যা করেছে বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে। শুধুমাত্র পাসপোর্ট বা কোন পরিচয়পত্র না থাকায় এসব অপমৃত্যুর খবর জানা যাচ্ছে না বা বাংলাদেশ হাইকমিশন পর্যন্ত পৌছাচ্ছে না। বেওয়ারিশ লাশ হয়ে মালয়েশিয়ার মাটিতে মিশে যাচ্ছে বাংলাদেশের হতভাগ্য এসব শ্রমিকরা। আধুনিক সভ্যতার প্রতি ঘৃনা ও হাজারো প্রশ্ন রেখে এভাবেই বিদেশ আসার স্বাদ পূর্ন হচ্ছে ওদের। এসব অপমৃত্যু শ্রমবাজারের সাফল্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে এবং জনশক্তি রপ্তনীর অনিয়ম আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। সর্বশেষ আত্মহত্যার ঘটনাটি ঘটেছে, কুয়ালালামপুর থেকে প্রায় ৬৫ কিলোমিটার দূরে কাজাং বাংগী এলাকায়।

স্থানীয় পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত ১ আগষ্ট আনুমানিক ভোর সাড়ে ৬ টায় হোষ্টেলের রান্নাঘরে গলায় গামছা পেচানো অবস্থায় মোঃ কিবরিয়া (২৭) নামে এক বাংলাদেশী যুবকের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তার পাসপোর্ট নং এ ০০৫৬৮১৪। সে কুমিল্লা মুরাদনগর থানার এলখাল গ্রমের কৃষক রফিকুল ইসলামের বড় ছেলে। গত ২৫ জুন রাতে কিবরিয়াসহ ৮ জনকে মালয়েশিয়া কেনশিশা নামের একটি আউটসোর্সিং কোম্পানীতে (১৮৫৬৩৯-ভি) পাঠায় ঢাকার আল ইসলাম ওভারসীজ (আর এল ১০৬)। ২৬ জুন থেকে ৪ দিন কুয়ালালামপুর বিমান বন্দর থেকে কেউ তাদের গ্রহণ করে নি। তারপর আরো ৮ দিন এয়ারপোর্ট ইমিগ্রেশন ডিপোতে তাদের আটক রাখা হয় বলে জানায় ঐ গ্রুপেরই সদস্য নোয়াখালী লক্ষ্মীপুরের শাহেদুল ইসলাম জেহাদ। এরপর থেকে তাদের কোন চাকুরীর ব্যাবস্থা করা হয় নি। তার মৃত্যুসংবাদ পেয়ে ঐ দিনই সেরডাং হাসপাতালে ছুটে যান হাইকমিশনের ওয়েলফেয়ার সহকারী মোকসেদ আলী। এ ব্যাপারে কাজাং বন্দর বারু বাংগী থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে। মামলা নং ০০৩৯৯৮/০৮। আজ বুধবার দিবাগত রাতে মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্সে তার (এম এইচ ১৯৬) লাশ ঢাকা পৌছাবে। নিহত কিবরিয়ার বাবা লাশ গ্রহন করবেন বলে জানা গেছে। উক্ত কেনশিশা আউটসোর্সিং কোম্পানীর পরিচালক হামজা বিন ইয়াকুবকে কয়েকবার ফোন করেও পাওয়া যায় নি। এদিকে উক্ত আল ইসলাম ওভারসীজের বিরুদ্ধে বহু অভিযোগ পাওয়া গেছে। চাকুরী না দিয়ে গোডাউনে শ্রমিক আটক, মেডিকেল আনফিট শ্রমিকদের দেশে না পাঠানো ও হয়রানী-নির্যাতনের মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। এসব ব্যাপারে এজেন্সীর মালিক মোঃ ইসলামের বিরুদ্ধে প্রতারনা ও নির্যাতনের অভিযোগে মালয়েশিয়ার বিভিন্ন থানায় একাধিক পুলিশ রিপোর্টও করেছে ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকরা।

এদিকে বাংলাদেশে টেলিফোনে কিবরিয়ার বাবার সাথে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, মৃত্যুর আগের দিন আমার সাথে শেষ কথা হয়। আমার ৪ ছেলে ২ মেয়ের মধ্যে সে ছিল বড় ছেলে। বাষ্পরুদ্ধ কন্ঠে তিনি বলেন, এই ছেলেই ছিল আমার একমাত্র ভরসা। আমি কাজকর্ম করতে পারি না। সে-ই ছিল একমাত্র রোজগারে ছেলে। মানুষের কথায় বিশ্বাস করে আড়াই লাখ টাকা দিয়ে ছেলেকে বিদেশ পাঠিয়েছি। দু’আড়াই ভরি স্বর্ণ বিক্রীর টাকা ছাড়া পুরো টাকাটাই সুদে নেয়া। ৭ হাজার টাকায় মাসে ১০ হাজার টাকা সুদ দিতে হয়। এখন আমি টাকা দেমু কেমনে? একদিকে ছেলে হারানোর শোক অন্যদিকে দেনার চিন্তায় কিবরিয়ার বাবা এখন পাগল প্রায়। তার উপর আত্মীয় পরিবেষ্টিত দালালদের ভয়েও তিনি আতংকিত। এ প্রদিবেদকের সাথে কথা বলার সময় নাজিম নামে এক লোক বার বার তার ফোন কেড়ে নিয়ে বাধাসৃষ্টি করছিলেন। বিষয়টি ধামাচাপা দিয়ে গ্রাম্য দালালদের রক্ষার চেষ্টা চলছে বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক গ্রামবাসী টেলিফোনে জানান। নিহত কিবরিয়ার বাবা রফিকুল ইসলাম বলেন, আমি মূখ্য-সূখ্য মানুষ কিছু বুঝি না। তবু ছেলের কষ্টে এজেন্সীর অফিসে গিয়েছিলাম যেন একটা চাকুরীর ব্যাবস্থা করে ওরা। কিন্তু আমার সাথে দুর্ব্যাবহার করে, ভয় ভীতি ও নানা হুমকী দিয়ে অফিস থেকে বের করে দিয়েছে। ছেলেকে যাবার সময় এক কেজি চিড়া দিয়েছিলাম। আমার বাপ ৪ দিন এয়ারপুটে ওগুলোই খাইছে। তিনি বলেন, দেনা-কর্জ করে গ্রামের মাঞ্জুর মাধ্যমে এজেন্সীকে টাকা দিয়ে ছেলে পাঠিয়েছি লাশ পাবার জন্য নয়। আমার ছেলেকে সেপশাল ভিসা ও ২৫ হাজার টাকা বেতন দেবার কথা বলে এত টাকা নিয়েছে। আমি এর বিচার চাই। ক্ষতিপূরনসহ তিনি সব টাকা ফেরত এবং ঐ এজেন্সী ও দালালের বিচার দাবি করেন। আত্মহত্যার পেছনে কি কারন থাকতে পারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, চাকুরী না পাওয়ায় ও দেনার চাপের কারনেই সে আত্মহত্যা করেছে বুঝতে পারি। এদিকে নিহত কিবরিয়ার স্ত্রী লুৎফা বেগম ৬ মাসের অন্তসত্ত্বা বলে জানা গেছে। ৭/৮ মাস আগে তাদের বিয়ে হয়। কিবরিয়ার আত্মহত্যায় পুরো পরিবার এখন শোকে মূহ্যমান। অসুস্থ্যতার কারনে তার বাবা কাজ করতে না পারায় ৮ জনের সংসারে সে-ই ছিল উপার্জক্ষম ব্যাক্তি। তাকে হারিয়ে পরিবারটির এখন পথে বসার উপক্রম হয়েছে।

এদিকে গত সোমবার বেতন ভাতাদি না পেয়ে আবারও হাইকমিশনে এসেছে এম্পেরিয়াল এজেন্সীর (আর এল ৪২৮) ২৪ জন শ্রমিক। আমেরিকা প্রবাসী রিপন সাহার প্রতারনার শিকার হয়ে এই এজেন্সীর বহু শ্রমিক ইতিপূর্বেও হাইকমিশনে এসেছে। রিপন সাহা আমেরিকার নাগরিক পরিচয় দিয়ে মালয়েশিয়ায় পাঠানো হাজার হাজার শ্রমিকের সাথে প্রতারনা করে বহু কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়ে অন্যদেশে পালিয়ে গেছেন। অসহায় শ্রমিকরা যখন মানবেতর জীবনযপন করেছে তিনি তখন কুয়ালালামপুরে কাড়ি কাড়ি টাকা ঢেলে আমোদস্ফুর্তি করেছেন। বর্তমানে রিপন সাহা অন্য এজেন্সীর মাধ্যমে দুবাইতে শ্রমিক পাঠানোর চেষ্টা করছেন বলে জানা গেছে। প্রতারিত শ্রমিক জয়নাল, সোহেল, ইসলাম জানায়- প্লাষ্টিক ফ্যাক্টরীর নামে পাঠিয়ে তাদের স’মিলে কাজ দেয়া হয়েছে। চুক্তিপত্রে কমপক্ষে ৭৫০ রিঙ্গিত বেতনের কথা উল্লেখ থাকলেও ওরা ২ মাস কাজ করে ২/৩ শ’ রিঙ্গিতের বেশী পায় নি। ২ লাখ টাকার উপর নিয়ে এক ফ্লাইটে গত ২৯ মে তাদের মালয়েশিয়া পাঠানো হয়েছে মাইন্ড বর্ন হোল্ডিং নামে একটি আউটসোর্সিং কোম্পানীর নামে।

মালয়েশিয়ার উুভত এসব পরিস্থিতি সামাল দিতে হাইকমিশনকেও বেগ পেতে হচ্ছে। একটি সমস্যার সমাধান হতে না হতেই আরেকটি সমস্যা উঁকি দিচ্ছে। যদিও হাইকমিশনের প্রচেষ্টাতে মালয়েশিয়ায় অনেক শ্রমিক সমস্যার সমাধান হয়েছে এবং বহু শ্রমিকই এখন আশানুরূপ ভালো বেতনও পাচ্ছে বলে জানা গেছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স ওয়েলফেয়ার এসোসিয়েশনের উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখছে।

Bangla Community News Tags: , ,

Related Bangla Community News:

Post Your Comments

All comments are subject to editorial review and decision.

*
To prove you're a person (not a spam script), type the security text shown in the picture. Click here to regenerate some new text.
Click to hear an audio file of the anti-spam word

Free Membership. Join Now!