ভূমধ্যসাগরে আরো ১৫ জনের সলিল সমাধি
ভূমধ্যসাগরে আরো ১৫ জনের সলিল সমাধি
দশ ঘণ্টা সাঁতরে লিবিয়ার উপকূলে উঠেছে মাদারীপুরের মিন্টু
সাঁতার কেটে ইংলিশ চ্যানেল বিজয় করার ব্রজেন দাসের কাহিনী নয়; নয় মায়ের অসুস্থতার সংবাদ শুনে ঝড়ের রাতে সাঁতরে নদী পার হওয়ার বিদ্যাসাগরের সেই অনুকরণীয় আবেগ-আবেদনের বাস্তবতা। রীতিমতো অতিলোভ এবং দুরাশার ওপর ভর করে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেয়ার অতি সম্প্রতির এক ঘটনা ভাবিয়ে তুলেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে। রাতের আঁধারে এ কাজটি করতে গিয়ে সলিল সমাধি হয়েছে বাংলাদেশের আরো ১৫ জন আদম সন্তানের। জীবনে ধনসম্পত্তির খোঁজে ইতালি কিংবা ইউরোপের কোনো দেশে পৌঁছাতে এ যাত্রার অপর এক যহযাত্রী আল-াহর অসীম কৃপায় প্রাণে বেঁচে গেছেন। যদিও বেঁচে থাকার জন্য প্রায় ২৯ লাখ ৬৫ হাজার ৫৩৮ বর্গকিলোমিটার আয়তন আর ৪ হাজার ৯১ মিটার গভীরতার ভূমধ্যসাগরে ১০ ঘণ্টা সাঁতার কাটতে হয়েছে তাকে। প-াস্টিকের একটি খালি ড্রাম অকস্মাৎ হাতে পাওয়ায় রক্ষা। কিন্তু দশ ঘণ্টা সাঁতার কাটার পর আবুল হোসেন মিন্টু নামের এ সৌভাগ্যবান বাংলাদেশি এক পর্যায়ে নিজেরই অজান্তে পৌঁছান লিবিয়ার ’জোয়ারা’ উপকূলে। এরপর তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ। ঠাঁই হয়েছে সেদেশের ছোরমান শহরের জেলখানায়। হাসপাতালে চিকিৎসা শেষে মাদারীপুর জেলার রাজৈর উপজেলার মাহেন্দ্রদী গ্রামের নুর হোসেন মুন্সীর ছেলে মিন্টু বর্তমানে সুস্থ বলে জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বাকি যে ১৫ জন বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে তাদের নাম-পরিচয় জানাতে পারেনি লিবিয়ায় অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস। লাশ শনাক্তের কাজ চলছে। তবে সংশি-ষ্টদের বাড়ি মুন্সীগঞ্জ, নরসিংদী, শরীয়তপুর ও মাদারীপুর এলাকায় বলে প্রাথমিক তথ্য দিয়েছেন বেঁচে যাওয়া একমাত্র যাত্রী মিন্টু। তিনি আগে থেকে কাউকেই চিনতেন না। নৌকায় ওঠার পর প্রায় দুইশ যাত্রীর মধ্যে ১৫ জন বাংলাদেশিকে তিনি পান। পরিচিত হয়ে ওঠার আগেই রাতের আঁধারে সমুদ্রে তলিয়ে যায় ওই নৌকাটি।
এর আগে ২০০৬ সালে এমনিভাবে আরো ১৭ জন বাংলাদেশি অতিলোভ ও দুরাশায় সাগরের স্রোতের টানে হারিয়ে যান। মাঝে মধ্যেই দু-একজন করে এমনিভাবে জীবনের চরম পরিণতিকে বরণ করে নিচ্ছেন কেবলই লোভে পড়ে। বিদেশে শ্রমবাজার বিস্তৃতির ক্ষেত্রে এ ধরনের ঘটনা উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেছে বাংলাদেশের লিবীয় দূতাবাস। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জরুরি ভিত্তিতে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার অনুরোধ জানিয়েছে লিখিত পত্রে। এমনকি বিদেশে চলাফেরার ক্ষেত্রে বাংলাদেশি এ ধরনের উচ্চাভিলাষী নাগরিকদের কি করতে হবে, কিভাবে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে সে বিষেয়ে কোনো পরামর্শ থাকলে তাও সুনির্দিষ্টভাবে দূতাবাসগুলোকে জানানোর অনুরোধ জানানো হয়েছে। লিবিয়ার ত্রিপলি থেকে দূতাবাসের ফার্স্ট সেক্রেটারি আকবর হোসেন এক পত্রে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিবকেও বিষয়টি জরুরি বিবেচনায় সমাধানের উদ্যোগ নেয়ার জন্য অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি।
লিবিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাসের বরাত দিয়ে ঢাকাস্থ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ৭ জুন তারিখে ভোররাতে লিবিয়ার জোয়ারা উপকূল থেকে প্রায় দুইশ যাত্রী একটি নৌকায় চড়ে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দেয়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। ওই নৌকায় বাংলাদেশের ১৬ জন এবং ভারত, পাকিস্তান, ইরাক, সুদান, ভুটান, মালদ্বীপ ইত্যাদি দেশের নাগরিক ছিলেন। সিসিলি দ্বীপে পৌঁছানোই ছিল তাদের প্রথম উদ্দেশ্য, সেখান থেকে তারা ইতালিতে যাওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন বলে জানা গেছে। কিন্তু দুই শতাধিক যাত্রী নিয়ে কয়েক ঘণ্টা চলার পর নৌকায় অতিরিক্ত পানি উঠতে শুরু করে। একপর্যায় ভারসাম্য হারিয়ে যাত্রীসহ নৌকাটি সমুদ্রে ডুবে যায়। রাতের আঁধারে দিক ঠিক করতে ব্যর্থ অনেকেই স্রোতের অনুকূলে ভেসে গেছেন অজানায়। সাঁতার না জানার কারণেও বেশ কয়েকজন ঘটনাস্থলেই তলিয়ে যান। আর সৌভাগ্যক্রমেই বেঁচে যান মিন্টু।
ত্রিপলির দূতাবাস জানিয়েছে, মিন্টু দশ ঘণ্টা সাঁতরে প্রাণে বাঁচলেও খুবই অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। তাকে এদেশের পুলিশ গ্রেফতার করেছে উপকূলে বেহুঁশ অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে। মিন্টুকে সে অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে সুস্থ করা হয়। এরপর জেলে। আবার তাকে নিয়ে যাওয়া হয় লিবিয়ার জাওয়াইয়া হাসপাতালে। সেখান তাকে দিয়ে অন্যান্য লাশ শনাক্ত করার জন্য দেখানো হয়। হাসপাতালে রাখা অনেক লাশের মধ্যে একজন বাংলাদেশি বলে মিন্টু শনাক্ত করতে পেরেছেন কিন্তু, তার পরিচয় বলতে পারেননি।
এদিকে নিখোঁজ কিংবা মৃত নাগরিকদের পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত দূতাবাস কিংবা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সংশি-ষ্টদের কেউই যোগাযোগ করেননি বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়। সার্বিক বিষয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে উদ্বেগের মধ্যে ফেলেছে বলে একটি সূত্র দাবি করেছে।
Bangla Community News Tags: ইতালি, প্রবাসী, মাদারীপুর, মুন্সীগঞ্জ
Evergreen Bangla Community
Post Your Comments