সৌদি প্রবাসী বাংলাদেশীদের ওপর নানা হয়রানি

সৌদি আরবে বাংলাদেশী শ্রমিক-ব্যবসায়ীদের মধ্যে মধ্যবিত্তদের আধিপত্য খর্ব করতে পরিকল্পিতভাবে এগুচ্ছে দেশটি। অনেক দিন থেকে যারা সে দেশে অবস্থান করছেন নানাভাবে তাদের ওপর কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। রিয়াদে অবস্থিত বাংলাদেশী ইন্টারন্যাশনাল স্কুল এন্ড কলেজের কলেজ শাখাও আগামী শিক্ষা বর্ষ থেকে বন্ধের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। নিয়ম করা হয়েছে, যেসব ছেলে-মেয়ের বয়স ১৮ বছর পেরিয়ে গেছে তাদের বাধ্যতামূলকভাবে দেশে ফেরত যেতে হবে। সম্প্রতি সৌদি আরবে গমনকারী বাংলাদেশী শ্রমিকদের সংখ্যা স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে। সৌদি আরবে অবস্থানরত বাংলাদেশীদের বেশ কয়েকজনের সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলে জানা গেছে এসব তথ্য। তারা জানিয়েছেন, সৌদী সরকারের কার্যক্রম দেখে মনে হচ্ছে, তারা কেবল কম পয়সার বাংলাদেশী শ্রমিক রাখতে চায়। এক্ষেত্রে কাগজে-কলমে কোন বিধি-নিষেধ আরোপ করা না হলেও দেশটিতে অবস্থান করা বাংলাদেশীদের ওপর বিভিন্নভাবে হয়রানি ও নির্যাতন করা হচ্ছে। আগে থেকে সৌদি আরবে অবস্থানরত বাংলাদেশী এবং নতুন গমনকারীদের মধ্যে কেউই পুলিশী হয়রানি থেকে রেহাই পাননি। বরং অনেক ক্ষেত্রে এ হয়রানি আরো বেড়েছে। পুলিশের সঙ্গে সঙ্গে সিটি কর্পোরেশন, ইন্টিলিজেন্স বিভাগ এমনকি প্রিন্সের নিজস্ব গোয়েন্দা বিভাগের লোকও এ অভিযানে যুক্ত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন সৌদি আরবে অবস্থানরত বাংলাদেশীরা।

রিয়াদে অবস্থানকারীদের কয়েকজন জানিয়েছেন, বাংলাদেশী অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে এখনো নিয়মিত অভিযান চলছে। অবৈধ অবস্থানকারী কেউ ধরা পড়লে আর ছাড়া পাচ্ছেন না। অন্যদিকে বৈধদের ধরা হলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ছেড়ে দেয়া হচ্ছে। কিন্তু এর মধ্যে টাকা-পয়সা, মোবাইল বা দামী কিছু থাকলে তা রেখে দিচ্ছে নিরাপত্তাকর্মীরা। বাংলাদেশীরা অভিযোগ করেছেন, অন্য দেশের লোকদেরকে ধরলে যেখানে মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যেই ছেড়ে দেয়া হচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশীদের ধরলেই আর ছাড়া হচ্ছে না।

অন্যদিকে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এমন অভিযোগের খবর অস্বীকার করা হয়েছে। তারা বলছেন, পরিস্থিতি একেবারেই স্বাভাবিক হয়ে গেছে। তাছাড়া বৈধদের ব্যাপারে সমস্যা হলেই কেবল সরকার তা দেখভাল করবেন, অবৈধদের ক্ষেত্রে নয়। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুল মতিন চৌধুরী জানিয়েছেন, সরকারের এ দৃষ্টিভঙ্গির কথা। তিনি জানান, কোন দেশের কোন সরকারই অবৈধ শ্রমিকদের দায়িত্ব নিতে পারেন না। তাছাড়া সৌদি আরবে অবস্থানরত অবৈধ শ্রমিকদের বিষয়েও সৌদি সরকার কোন সিদ্ধান্ত নিলে সেখানে আমাদের কিছুই বলার নেই।

গত ২৩ বছর ধরে সৌদি আরবে অবস্থানরত গোপালগঞ্জের শামীম আহমেদ কয়েক দফা বেতন কমে যাওয়ার কারণে চাকরি ছেড়ে ব্যবসা শুরু করেছিলেন। দু’তিন বছরের মধ্যে তিনি বেশ উন্নতিও করেছিলেন। মধ্যবয়সী শামীম জানান, এখন ঠিক ওভাবে আর কাউকে গ্রেফতার করা হচ্ছে না। তবে আমাদের এমন নজরদারিতে রাখা হয়েছে যে, একমাত্র চাকরিজীবী ছাড়া কারো পক্ষে আর ঘর থেকে বের হওয়া দায়। তিনি জানান, রিয়াদের ফয়সালিয়া এবং সোলাই নামক দুটি স্থানে স্ক্রাব মার্কেটে অন্তত ৫ হাজার বাংলাদেশী কাজ করতো। কিন্তু গত ছয় মাসের মধ্যে এই মার্কেটে একজন বাংলাদেশীও আর যেতে পারেনি।

শামীম জানিয়েছেন, এসব মার্কেটে ব্যবসা করা ব্যবসায়ী-শ্রমিকদের অধিকাংশই পরিবার পরিজন নিয়ে সৌদি আরবে অবস্থান করতো। অনেকে আবার নিজেদের ব্যবসার উন্নতি দেখে দেশ থেকে আরো আত্মীয়-স্বজনকেও সৌদি আরবে নিয়ে এসেছিলেন। এদের সবাইকে এখন হয় পুলিশের হাতে ধরা দিতে হচ্ছে, নয়তো ঘরে বসে থাকতে হচ্ছে। শামীমের ব্যবসায়িক পার্টনার হালিম জানান, দেশে ফিরে আসা ছাড়া বিকল্প কোন উপায় নেই। তিনি বলছেন, মাত্র এক দশক আগেও সৌদি আরবে যে সব চাকরিতে এক থেকে দেড় হাজার রিয়াল বেতন পাওয়া যেত, বেশি বেশি শ্রমিক আমদানির কারণে এখন তা নেমে চলে এসেছে তিন/চার’শ রিয়ালে। ব্যবসায় এর চেয়ে অনেক বেশী আয় হওয়ায় অনেকের পক্ষেই আর এসব চাকরিতে পোষাবে না।
শামীম এবং হালিমের মতো অনেকেই এখন দিন গুনছেন, যদি দু’এক মাসের মধ্যে পরিস্থিতি না বদলায় তাহলে দেশেই ফিরে আসবেন তারা। তাছাড়া যাদের ছেলেমেয়ে বিভিন্ন স্কুল-কলেজে পড়াশোনা করছে জুলাই মাসে তাদের পরীক্ষা শেষ হলেই দেশে ফিরে আসবেন বলে জানিয়েছেন আজগর আলী।

সৌদি প্রবাসী বাংলাদেশী স্ক্রাব ব্যবসায়ীদের সংগঠন বাংলাদেশ স্ক্রাব অ্যাসোসিয়েশন অব সৌদি আরব-এর সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার আশরাফুল আলম ইত্তেফাককে জানান, অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশীরাও অনেক অপরাধমূলক কাজের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু যেভাবে একটি প্রজন্মকে দেশে ফেরত পাঠিয়ে দেয়া হচ্ছে তাও অমানবিক। পুলিশের নির্যাতন সম্পর্কে তিনি বলেন, বাংলাদেশীরা যে অপরাধ করেছে পুলিশ এখন আমাদের সঙ্গে তার চেয়ে বড় অপরাধ করছে। তিনি জানান, তাদের হিসাব মতে বর্তমানে শুধু রিয়াদের কারাগারেই ১৪শ’ থেকে ১৫শ’ বাংলাদেশী আটক আছে।

Bangla Community News Tags: ,

Related Bangla Community News:

Post Your Comments

All comments are subject to editorial review and decision.

*
To prove you're a person (not a spam script), type the security text shown in the picture. Click here to regenerate some new text.
Click to hear an audio file of the anti-spam word

Free Membership. Join Now!