ড. কামাল হোসেন একটু সাহসী বা সঠিক ভূমিকা রাখলে হয়তো চার নেতাকে জেলহত্যাকান্ডে হারাতে হতো না
ড. কামাল হোসেন একটু সাহসী বা সঠিক ভূমিকা রাখলে হয়তো চার নেতাকে জেলহত্যাকান্ডে হারাতে হতো না - নিউইয়র্ক বাংলাদেশ প্রেস ক্লাবের মতবিনিময় সভায় আব্দুল গাফফার চৌধুরী
বর্ণমালা নিউজ (নিউইয়র্ক)ঃ তত্বাবধায়ক সরকারের সংষ্কার কর্মসূচীকে উদ্দেশ্য প্রণোদিত মনে করেন একুশের অমর গানের রচনাকারী আব্দুল গাফফার চৌধুরী। তার মতে, নির্বাচনই হচ্ছে সংষ্কার, সংষ্কার করে কেউ নির্বাচন করে না। তিনি পাল্টা প্রশ্ন করে বলেন, নির্বাচন মানুষ করে কেন? ধরুন, আমাকে ভোট দিয়েছেন, আর আমি ক্ষমতায় গিয়ে চুরি করেছি, দেশ শাসনে ব্যর্থ হয়েছি, জনগন হলো বিচারক- তারা ভোট দিয়ে রায় দিয়ে এজন্য আমাকে ক্ষমতা থেকে বিদায় করে দিবে এবং এটাই সংষ্কার। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বুশ ভুল করেছেন ইরাক নিয়ে, কিন্তু কই, সেজন্য তাকে আদালতে বিচার করা হচ্ছে না যে, তিনি বে আইনী কিছু করেছেন, মিথ্যা বলে যুদ্ধ শুরু করেছেন। নির্বাচনের মাধ্যমে তাকে বা তার দলের প্রতি মানুষ তাদের বিচার বোধ প্রয়োগ করবে- গত ২৯ এপ্রিল মঙ্গলবার নিউইয়র্ক বাংলাদেশ প্রেস ক্লাব আয়োজিত মত বিনিময় সভায় বাংলাদেশের রাজনীতির গতি প্রকৃতি ও আসন্ন নির্বাচন নিয়ে তার ধারণা প্রকাশ করেছেন এভাবেই আব্দুল গাফফার চৌধুরী। তত্বাবধায়ক সরকারের সংষ্কারের উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করে লন্ডন প্রবাসী কলামিস্ট গাফফার চৌধুরী আরও বলেন, সংষ্কার উপর থেকে রুল করে দেবার বিষয় নাকি যে হাসিনাকে নেতৃত্ব থেকে বিদায় করতে হবে, অমুককেও করতে হবে, তমুককেও করতে হবে। এটাতো আমরা ব্রিটিশ আমলেও দেখিনি। ব্রিটিশ গভর্মেন্টতো কোনদিন বলে নাই কংগ্রেস থেকে গান্ধীকে বাদ দাও, মুসলিম লীগ থেকে জিন্নাহকে- তার পর আমরা তোমাদের সাথে আলোচনায় বসবো। পাকিস্তান আমলে শেখ মুজিবর রহমান রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার আসামী ছিলেন। ঐ মামলা যদি শেষ হতো তা হলে তার হয়তো ফাঁসিও হতো। সেই লোককে আইয়ুব খান মুক্তি দিয়ে তার সঙ্গেই আলোচনায় বসেছিলেন। আইয়ুবতো কোরবানী আলির সঙ্গে গিয়ে আলোচনায় বসেননি। এরা (তত্বাবধায়ক সরকার) ফার্স শুরু করছে মানুষের সাথে। দুজনকে (হাসিনা ও খালেদা) কতগুলো ভূঁয়া সাধারন মামলায় বন্দী রেখে কতগুলো হ্যান্ড পিক ট্রিগার নিয়ে এগুচ্ছে। আবার পিছন থেকে ডিএফআই এদেরকে ভয়ভীতি দেখিয়ে, এদের দুর্নীতির হিসাব দেখিয়ে এদেরকে দিয়ে সংষ্কারের কথা বলাচ্ছে। এদেরকে ব্ল্যাক মেইল করা হচ্ছে। জ্ঞাত আয়ের সূত্র অর্থাৎ একটি ব্যাংকের চেয়ারম্যান ছিলেন আব্দুল জলিল, আর তাকেই আগে দুর্নীতির দায়ে গ্রেফতার করা হয়েছে। ব্ল্যাক মেইল হচ্ছেন বিচারপতিরাও। দুটি প্লট নিয়ে ফেঁসে আছেন প্রধান বিচারপতিও। তাই সঠিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারছেন না তিনিও।
জ্যাকসন হাইটসের বাংলাদেশ প্লাজার সভা কক্ষে আয়োজিত নিউইয়র্ক বাংলাদেশ প্রেস ক্লাবের এই মত বিনিময় সভায় সভাপত্বি করেন ক্লাবের সভাপতি সাপ্তাহিক বাংলা পত্রিকার সম্পাদক মাহবুবুর রহমান, শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন প্রবীণ সাংবাদিক মোহাম্মদ উল্ল্যাহ্। সভা পরিচালনা করেন প্রেস ক্লাবের সমন্বয়কারী সাপ্তাহিক দেশ বাংলার উপদেষ্ঠা ও বর্ণমালা নিউজ নিউইয়র্কের সম্পাদক মাহফুজুর রহমান।
বর্তমান সরকারের কার্যক্রম প্রসঙ্গে উপস্থিত শ্রোতাদের প্রশ্নের জবাবে গাফফার চৌধুরী বলেন, দু বছর হতে চললো এরা ক্ষমতায়. এ সময়ে কি দিয়েছে তারা জনগনকে? আগের বিএনপি গভর্মেন্ট ভালই অত্যাচার করেছে মানুষকে, তার পরও দেশে খাদ্যের অভাব হতে দেয়নি যদিও দাম বেড়েছে তাদের সময়েও। আর তার আগে আওয়ামী লীগের সময়ে খাদ্যেও মূল্য বাড়েনি। তারা খাদ্যমূল্য স্থিতিশীল রেখেছিলো, পার্বত্য চুক্তি করেছিলো, ৩০ হাজার কিউসেক পানি আদায় করেছিরো ভারতের কাছ থেকে। অবশ্য অন্য ক্ষেত্রে তাদের ব্যর্থতাও ছিলো। আর এই সরকার আটটা ঘোড়া ছাড়া দেশবাসীকে কি এনে দিয়েছে জানতে চাই।
গনতন্ত্রের পক্ষে এবং গনতান্ত্রিক আন্দোলনে সংবাদপত্রের যে ভূমিকা থাকা উচিৎ. বর্তমানে বাংলাদেশে তা কতটুকু আছে সে বিষয়ে তার মন্তব্য জানতে চাওয়া হলে গাফফার চৌধুরী বলেন, এক সময়ে স্বৈরাচারের লক্ষ্য ছিলো সংবাদপত্র নিয়ন্ত্রণ করা। আর এখন স্যাটেলাইট যুগে অবাধ তথ্য প্রবাহের যুগে তারা কৌশল পাল্টে একটা জায়গায় দশটা সংবাদপত্র প্রকাশের কৌশল নিয়ে তিন চারটিকে দিয়ে এমন সব নিউজ প্রচার করে মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছে। এখন ঢাকায় জনসংখ্যার মতো খবরের কাগজের সংখ্যা বাড়ছে। বিশেষ জায়গা থেকে দেয়া সংবাদ ছাপাচ্ছে তারা মানুষকে বিভ্রান্ত্র করতে। তাই দেখছেন কখনও শেখ রেহানা প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন বা অমুক দিন এটা হচ্ছে, তমুক দিন ওটা হচ্ছে- এ রকম সাপ্লাই করা নিউজ ছাপাচ্ছে দুতিনটি কাগজ, আমি এদের নাম বলবো না। দেশে আসলে এখন ’ব্যাড জার্নালিজমের জোয়ারে গুড জার্নালিজম নির্বাসনে চলে যাচ্ছে’। ব্ল্যাক মানি দেশের সংবাদপত্র শিল্পকে ধ্বংস করে দিয়েছে। যুগান্তরের মালিক ম্যানেজ করে বেড়িয়ে এসেছেন, জনকণ্ঠের মালিক পারেননি। ঝি’কে মেরে বউকে শিক্ষা দেয়ার মত ঘটনা ঘটছে। প্রথম আলোর সার্কুলেশন তিন লাখেরও বেশী তারা যা লিখছে মানুষ তা পড়ছে। কিন্তু যা লেখা উচিৎ তা লেখলে এর মালিক লতিফুর রহমানের সামনে চলে আসবে খড়গ। কারন তার বিরুদ্ধেও অভিযোগ রয়েছে।
দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেফতারকৃত রাজনীতিবিদদের সম্পর্কে ড. কামাল হোসেনের সাম্প্রতিক মন্তব্যকে আদালত অবমাননার শামিল অ্যাখ্যায়িত করে গাফফার চৌধুরী বলেন, বিচারের রায়ের আগে কারও সম্পর্কে একজন আইনজীবি হয়ে তিনি এটা বললেন কিভাবে আমি ভাবতে পারিনা। কামাল হোসেন রাজনৈতিক দল করছেন। গণফোরামের সভা করছেন। দল পরিচালনা করতে তিনি কোথা থেকে অর্থ পাচ্ছেন? ঢাকায় একটি জনসভা করতে কম কওে হলেও ১৫ লাখ টাকা খরচ হয়। এটা কোথা থেকে পায় গণফোরাম। সন্ত্রাসীদেও বিরুদ্ধে কথা বলেন তিনি। অথচ হত্যাকান্ডের অভিযোগে অভিযুক্ত মোস্তফা মহসিন মন্টুকে নিয়ে দল গড়েন তিনি। মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানীর হয়ে দেশের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক মামলাগুলো পরিচালনা করেন- এতে কোন দোষ দেখেন না নিজে। আমার মনে হয়, পঁচাত্তরে লন্ডনে অবস্থানরত ড. কামাল হোসেন একটু সাহসী বা সঠিক ভূমিকা রাখলে হয়তো চার নেতাকে জেলহত্যাকান্ডে হারাতে হতো না।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ভারত এখন আর গনতান্ত্রিক ব্যবস্থা নিয়ে ভাবে না। আজকের ভারতে নেহরু বা ইন্দিরা গান্ধীর সময়ের মত রাজনৈতিক মূল্যবোধ সক্রিয় না। ভারত এখন চলে টাটা আর আম্বানীর মত কোম্পানীর স্বার্থে যেমন চলছে আমেরিকা কর্পোরেট বডির ইচ্ছায়। তাই শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হবেন কিনা তা নিয়ে এখন আর ভাবে না ভারত। আমার ধারণা বরং ভারতের ভরসা পেয়েই শেখ হাসিনাকে গ্রেফতার করতে পেরেছে সরকার। অন্যদিকে ইসরাইলের সাথে ভারতের সামরিক চুক্তি হবার পর এখন ভারতীয় উপমহাদেশে নতুন নতুন সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। এ অঞ্চলে ইসরাইলের গোয়েন্দা সংস্থা মোশাদের কার্যক্রম বিস্তারিত হচ্ছে ভারতের সহযোগিতায়। ভারত-ইসরাইল এই সখ্যতার কারনে ভারতকে বাদ দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর আলাদা একটি জোট গঠন করা উচিৎ নিজেদের স্বার্থেই। কিন্তু পাকিস্তানের কারনে সেটা সম্ভব হবে না।
তত্বাবধায়ক সরকারের আমলে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের জোরালো দাবীর বিষয়টিকে সন্দেহের চোখে দেখছেন এই প্রবীণ কলামিস্ট। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যেভাবে গোলাম আযমের নাগরিকত্ব যেভাবে দেয়া হয়েছিলো আমার ভয় হয় তেমনি লোক দেখানো বিচারের মাধ্যমে একজনকে বিচারে দোষী সাব্যস্ত করে বাকীদের নিরাপরাধ প্রমাণ করে ছেড়ে দেয়া হতে পারে। গাফফার চৌধুরী বেদনাহতভাবে বললেন, আমার দুঃখ লাগে যে আদালত গোলাম আযমকে নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দিয়েছিলো তাতে সাবেক তত্বাবধায়ক সরকার প্রধান হাবিবুর রহমানও ছিলেন। তার কাছে জানতে চেয়েছিলাম কেন গোলাম আযমকে নাগরিকত্ব দিলেন? উত্তরে তিনি বলেছিলেন এটা তার বার্থ অব রাইট। তাহলে আজ কেন তসলিমা নাসরিনের নাগরিকত্ব কেড়ে নেয়া হচ্ছে? সে তো গোলাম আযমের মত কোন অপরাধ করেনি।
দেশে মৌলবাদের উত্থান হলেও একুশের কবি গাফফার চৌধুরী ভীষণ আশাবাদী যে মৌলবাদ বাংলাদেশকে গ্রাস করতে পারবে না। তালেবানরা এদেশকে দখল করতে পারবে না। কারন তিনটি রক্ষা কবচ এ থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা করবে। এর প্রথমটি হচ্ছে, চর্চ্চাপদ থেকে এ পর্যন্ত রচিত বাংলা সাহিত্য যা অসাম্প্রদায়িকতার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন হিসাবে বাঙ্গালীকে লালন করছে, দ্বিতীয়ত রবীন্দ্রনাথ- রবীন্দ্র চর্চ্চা করে বাঙ্গালী নিজেকে সাম্প্রদায়িকতা মুক্ত রাখতে পারছে। শেষতঃ বঙ্গবন্ধুর পরিবার যতদিন টিকে থকবে ততদিন বাংলাদেশ তালেবান মুক্ত থাকবে।
মত বিনিময় সভায় উপস্থিত থেকে প্রশ্নোত্তর পর্বে অংশ নেন নিউইয়র্ক বাংলাদেশ প্রেস ক্লাবের উপদেষ্ঠা ভয়েস অব আমেরিকার নিউইর্ক প্রতিনিধি জাকিয়া খান ও কবি হাসানুর রহমান, প্রেস ক্লাবের কোষাধ্যক্ষ শেখ সিরাজুল ইসলাম, নির্বাহী সদস্য আবু তাহের, রিমন ইসলাম, মেজবাহউদ্দিন,সদস্য মমিন মজুমদার ও আজাদ আহমেদ। এছাড়া প্রবীণ সাংবাদিক কাজী মন্টু ও নিনি ওয়াহেদ, সাপ্তাহিক বাঙ্গালীর চিফ রিপোর্টার গোলাম মল্লিক, এনওয়াই ডট কমের সম্পাদক মুজাহিদ আনসারী, বাংলাদেশ সোসাইটি নিউইয়র্কের সাবেক সভাপতি মুজিব উর রহমান, সব্যসাচী শিল্পী ও মুক্তিযোদ্ধা তাজুল ইমাম, লেখিকা মিনা ফারাহ, অভিনেত্রী লুৎফুন্নাহার লতা, কবি হাসান আব্দুল্লাহ, মুক্তিযোদ্ধা মিজানুর রহমান দুলাল, মফিজউদ্দিন, কামরুল ইসলামও প্রশ্নোত্তর পর্বে অংশ নিয়ে গাফফার চৌধুরীর কাছ থেকে বিভিন্ন বিষয়ে তার মন্তব্য জানতে চান।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্বে লেখিকা মিনা ফারাহ তার সদ্য প্রকাশিত গ্রন্থ ’হিটলার থেকে জিয়া’র একটি কপি আব্দুল গাফফার চৌধুরীকে উপহার দেন।
Bangla Community News Tags: আওয়ামী লীগ, জ্যাকসন হাইটস, নিউইয়র্ক, প্রবাসী, বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশ সোসাইটি, বিএনপি, মুক্তিযোদ্ধা, যুদ্ধাপরাধী, লন্ডন, শেখ হাসিনা
Evergreen Bangla Community
Post Your Comments