নিউইয়র্কে গ্রামীণ আমেরিকা’র উদ্বোধন উপলক্ষে ডঃ ইউনূসকে ঘিরে তুলকালামকান্ড
নিউইয়র্ক থেকে এনাঃ উত্তর আমেরিকায় বাংলাদেশীদের বানিজ্যিক রাজধানী হিসেবে খ্যাত নিউইয়র্ক সিটির জ্যাকসন হাইটসে গ্রামীণ আমেরিকা ব্যাংকের উদ্বোধন উপলক্ষে ২৫ এপ্রিল লংকাকান্ড ঘটে গেছে। সিএনএন, আলজাজিরা, এনবিসি, ফক্স টিভি, নিউইয়র্ক টাইমস, ওয়াল স্ট্রীট জার্ণাল, বার্তা সংস্থা এনা, এনটিভি, চ্যানেল আই প্রভৃতি মিডিয়ার টিভি ক্রু এবং বিশেষ সংবাদদাতারা ক্ষুদ্র ঋণের মাধ্যমে দারিদ্র্য মুক্তির জনক শান্তিতে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী ডঃ মুহম্মদ ইউনূসের সাক্ষাৎকার নেয়া উপলক্ষে সমগ্র এলাকায় তুলকালাম কান্ড ঘটে যায়। আমেরিকার জনপ্রিয় সিনেমার শুটিংয়ের সময় যেমন রাস্তাঘাট বন্ধ করে ক্যামেরাম্যান, পরিচালক, প্রযোজকরা ব্যস্ত হয়ে পড়েন প্রত্যাশিত দৃশ্যটিকে ধারণের জন্য, ঠিক তেমনি পরিস্থিতি হয় ডঃ ইউনূসকে ঘিরে। বাংলাদেশের গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা এবং সর্বজন শ্রদ্ধেয় ডঃ ইউনূসকে যারা চেনেন না তারা প্রথম দৃষ্টিতেই ভেবেছেন যে তিনি হয়তো পাশ্চাত্যের জনপ্রিয় কোন অভিনেতা। সেভাবেই ঘিরে ধরে ক্যামেরার সামনে দাঁড় করিয়ে সাক্ষাৎকার নেয়া হয়। আবার কখনো বা বাংলায় লেখা সাইনবোর্ডওয়ালা দোকানের সামনে দিয়ে হেঁটে হেঁটে টিভির সাক্ষাৎকার নেয়া হয়েছে। মজার ব্যাপার হচ্ছে, ব্যস্ততম একটি সিটিতে দীর্ঘক্ষণ ধরে এমন পরিস্থিতি ঘটা সত্বেও পথচারি কিংবা কৌতুহলী আমেরিকানরা কোন উচ্চবাচ্য করেননি, যানবাহন চলাচলে বিঘ্ন ঘটা সত্বেও পুলিশ কিংবা ট্রাফিক সার্জেন্ট এসে বিশেষ কোন অবস্থান নেননি। পথচারি এবং আশপাশের লোকজনই নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করেছেন মানবতার জন্যে নিবেদিত এই ব্যক্তির সাক্ষাৎকার গ্রহনের নির্মল পরিবেশ সমুন্নত রাখতে। প্রায় প্রতিটি মিডিয়া একই ধরনের প্রশ্ন করেছেন ডঃ ইউনূসকে। আমেরিকায় হাজার হাজার কোটি টাকার মুলধন নিয়ে অসংখ্য ব্যাংক কাজ করছে, তেমনি পরিবেশে গ্রামীণের ব্যাবসার প্রতি আমেরিকানদের দৃষ্টি আসবে কেন? জবাবে ডঃ ইউনূস বলেছেন, আজ থেকে ২৫ বছর আগে বাংলাদেশে যখন গ্রামীণ ব্যাংকের পরিকল্পনার কথা বলেছিলাম, তখনও এমনি প্রশ্নবাণে জর্জড়িত করা হয় আমাকে। সময়ের ব্যবধানে আজ বাংলাদেশের সীমানা পেড়িয়ে আমেরিকার মত ধনী রাষ্ট্রের সবচেয়ে জনবহুল সিটিতে গ্রামীণের ধ্যান ধারনায় ব্যাংক চালু হতে যাচ্ছে-এটাই বড় কথা। এবং বিশাল মূলধনের ব্যাংকের সাথে আমাদের কোন প্রতিযোগিতা নেই, তবে ঐসব ব্যাংক সুদ নেয় কখনো কখনো ২০০% হারে। আমার গ্রামীণ আমেরিকায় তেমন সুদের বালাই থাকবে না। স্বল্প আয়ের লোকজন অবাধে ঋণ নেবেন এবং ব্যবসায় তা বিনিয়োগ ঘটাবেন। ইমিগ্র্যান্টদের অনেকেই আমেরিকান ব্যাংকের সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন না, ইমিগ্রেশনের স্ট্যাটাসের অভাবে অনেকে একাউন্ট খোলার যোগ্যতাই অর্জন করতে পারেন না। কিন্তু আমাদের গ্রামীণে সে ধরনের বিধি নেই। ফলে সাধারণ মানুষের জন্যে গ্রামীণ আমেরিকানের গুরুত্ব অপরিসীম বলে বিবেচিত হবে অল্প সময়েই। ডঃ ইউনূস বলেন, আজ আমার খুবই ভালো লাগছে যে, এই শাখার উদ্বোধনের প্রাক্কালেই বাল্টিমোর, শিকাগো, মিশিগান, নিউজার্সী, বস্টন থেকে আবেদন এসেছে গ্রামীণের শাখা খোলার জন্য। ডঃ ইউনূস দৃঢ়তার সাথে বলেন, জ্যাকসন হাইটসের এই শাখার কার্যক্রমের মাধ্যমে গ্রামীণ আমেরিকা বিভিন্ন সিটিতে বিস্তৃত হবে। এক সময় দেখা যাবে নামি-দামী অনেক ব্যাংকের চেয়ে আমাদের ব্যাংকেই গ্রাহক সেবা ভালো হচ্ছে। বার্তা সংস্থা এনার প্রশ্নের জবাবে ডঃ ইউনূস বলেন, আমেরিকার মত ধনী দেশে গ্রামীণের কর্মসূচি চালুর ব্যাপারটি কিন্তু সহজ নয়। এটা বড় ধরনের একটি চ্যালেঞ্জ আমাদের জন্য। তবে আমি জানি, আমরা এ চ্যালেঞ্জে জয়ী হবো। কারণ বাংলাদেশের চেয়ে এখানকার স্বল্প আয়ের মানুষেরা অনেক বেশী সচেতন। তিনি বলেন, গত বছরের জানুয়ারিতে অনানুষ্ঠানিকভাবে এই ব্যাংকের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ১৫ এপ্রিল পর্যন্ত দু’শত গ্রাহক ঋণ নিয়েছেন এবং তারা সকলেই শর্ত অনুযায়ী পরিশোধ করেছেন এবং নতুন করে আবার নিচ্ছেন। তিনি বলেন, গ্রাহকের মধ্যে বাংলাদেশী এবং হিসপ্যানিকরা রয়েছেন। ডঃ ইউনূস বলেন, প্রচলিত ধ্যান-ধারণায় হাজার কোটি টাকা লোকসান যাচ্ছে বিভিন্ন ব্যাংকের। দেউলিয়াত্ব ঘোষণা করছে অনেকে। সুতরাং এখন সময় এসেছে নতুন ভাবধারায় নবউদ্যমে ব্যাংকিং ব্যবস্থা চালুর ব্যাপারে সংশি্নষ্টদের ভেবে দেখার।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তৃতাকালে ডঃ ইউনূস বলেছেন, সারাবিশ্বে গরিবী হঠাও আন্দোলনের জন্যে সকলকে একযোগে কাজ করতে হবে। তবে বক্তৃতার মধ্যে পরিকল্পনাগুলোকে আটকে রাখলে চলবে না, কাজও করতে হবে। কাজ করে প্রমাণ দিতে হবে যে আমরা সকলেই গরিবী হঠাতে বদ্ধপরিকর। এ সময় নিউইয়র্কে বাংলাদেশের কন্সাল জেনারেল মোহাম্মদ শামসুল হক এবং নিউইয়র্ক সিটি কাউন্সিলম্যান এরিক গয়াও বক্তৃতা করেন। বাংলাদেশী-আমেরিকান একদল শিশুর কন্ঠে স্বাগত সঙ্গীতের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা ঘটে। স্বাগত বক্তব্য রাখেন গ্রামীণ আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ভিডর জর্জেনসেন এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট রিটু চ্যাটরী মিডিয়ার সাথে ডঃ ইউনূসের সাক্ষাৎকারের সমন্বয় করেন। এই শাখার ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন বাংলাদেশী শাহনেওয়াজ। তিনি বাংলাদেশে গ্রামীণ ব্যাংকের সাথে দীর্ঘদিন জড়িত ছিলেন।
গ্রামীণ আমেরিকা হচ্ছে গ্রামীণ ট্রাস্টের একটি উদ্যোগ। এর সাথে গ্রামীণ ব্যাংকের কোন সম্পর্ক নেই বলে ডঃ ইউনূস উলে্নখ করেন।
গ্রামীণ আমেরিকার ব্যাপারে বাংলাদেশী-আমেরিকানদের মধ্যে তেমন কোন উৎসাহ-উদ্দীপনা পরিলক্ষিত না হলেও মেক্সিকান, ডোমিনিকান, সেন্ট্রাল আমেরিকান ইমিগ্র্যান্টদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহপ পরিলক্ষিত হচ্ছে।
Bangla Community News Tags: ইমিগ্রেশন, ইমিগ্র্যান্ট, কন্সাল জেনারেল, জ্যাকসন হাইটস, ডঃ ইউনূস, নিউইয়র্ক, নিউজার্সী
Evergreen Bangla Community


Post Your Comments