মার্কিন সিটিজেনশিপের আবেদন নাকচের পর বহিষ্কারের হার বেড়েছে
নিউইয়র্ক থেকে এনাঃ সিটিজেনশিপ কিংবা গ্রীণকার্ডের আবেদনকারীদের ব্যাকগ্রাউন্ড ইলেক্টনিক্স পদ্ধতিতে চেকিংয়ের সময় ৮০% ছাড়পত্র পাচ্ছে খুব সহজেই। অবশিষ্ট ২০% এর জন্যে অধিক সময় লাগে। এর মাত্র ১% কখনোই ছাড়পত্র পায় না। অর্থাৎ ঐ ১% এর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে কিংবা আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী চক্র অথবা সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্রের সাথে তাদের সম্পর্ক রয়েছে। হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ডিপার্টমেন্টের পক্ষে নিউইয়র্কস্থ ডিস্ট্রিক্ট ডিরেক্টর আন্দ্রিয়া জে কুয়ারেন্টিলো এনাকে এসব তথ্য জানিয়েছেন। অপর একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র বলেছে, গত দু’বছরে বেশ কয়েক ডজন বাংলাদেশীর আবেদনও নাকচের পর তাদেরকে বহিষ্কার করা হয়েছে অর্থাৎ সিটিজেনশিপ নিতে গিয়ে গ্রীণকার্ড হারিয়েছেন পুরনো ক্রাইমের জন্যে।
নিউইয়র্কে ফেডারেল পস্নাজায় আহূত এক সংবাদ সম্মেলনে বার্তা সংস্থা এনার প্রশ্নের জবাবে মিস আন্দ্রিয়া আরো বলেন, বর্তমানে সিটিজেনশিপ এবং গ্রীণকার্ডের জন্যে ৩ লাখ আবেদন এফবিআইয়ের ছাড়পত্রের অপেক্ষায় রয়েছে। তিনি বলেন, এফবিআই ছাড়াও কয়েকটি সংস্থা ব্যাকগ্রাউন্ড পরীক্ষা করছে। তবে এই ধীরগতিকে কাটিয়ে উঠার জন্যে অতিরিক্ত ১৫ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করা হয়েছে। এছাড়া আবেদনগুলো দ্রম্নত প্রসেসিংয়ের জন্যে অতিরিক্ত লোক নিয়োগের পরিকল্পনাও রয়েছে। তিনি বলেন, ইতিমধ্যেই গৃহিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ১৮০ দিন তথা ৬ মাসের অধিক সময় যাবত এফবিআইয়ের ছাড়পত্রের জন্যে পেন্ডিং থাকা আবেদনের বিপরীতে গ্রীণকার্ড ইস্যুর কার্যক্রম শুরু হয়েছে। এরপর এফবিআই যাদের ব্যাপারে আপত্তি করবে তাদের গ্রীণকার্ড বাতিল করা হবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, তবে সিটিজেনশিপের আবেদন এভাবে প্রসেসিংয়ের কোন অবকাশ নেই। তবে পরিবর্তিত ব্যবস্থা হিসেবে ৩ বছরেরও অধিক সময় যাবত পেন্ডিং আবেদন এ বছরের মে মাসের মধ্যে প্রxেসংয়ের কাজ শেষ হচ্ছে। দু’বছরের অধিক সময় যাবত পেন্ডিং আবেদনগুলোর প্রসেসিং সম্পন্ন হবে জুলাই মাসের মধ্যে, এক বছরের অধিক সময় যাবত পেন্ডিং আবেদনের প্রসেসিং শেষ হবে এ বছরের নভেম্বরের মধ্যে। ৬ মাসের অধিক পেন্ডিং রয়েছে এমন আবেদনের প্রসেসিং শেষ হবে আসছে ফেব্রয়ারির মধ্যে। বর্তমানের পরিকল্পনা অব্যহত থাকলে আগামী বছরের জুন মাসে যারা সিটিজেনশিপের জন্যে আবেদন করবেন তার ৯৮% এর প্রসেসিং সম্পন্ন হবে ৩০ দিনের মধ্যে এবং অবশিষ্ট ২% এর কাজ শেষ হবে ৯০ দিনের মধ্যে। হোমল্যান্ড সিকিউরিটি ডিপার্টমেন্টের যোগাযোগ বিষয়ক অফিসের নর্থইস্ট এরিয়া ম্যানেজার শ্যন সুইচার ঠিকানার প্রশ্নের জবাবে বলেছেন, ২-০০৬ সালের মে মাসের মধ্যে সিটিজেনশিপের জন্যে আবেদনকারীদের ২৯৮০০ জনের ব্যাকগ্রাউন্ড চেকের কাজ এখনও ঝুলে রয়েছে এফবিআই অফিসে। ইউএসসিআইএস এবং এফবিআইয়ের যৌথ পরিকল্পনা অনুযায়ী এগুলো এখন দ্রত প্রসেসিং হচ্ছে। তিনি বলেন, চলতি মাস পর্যন্ত এফবিআইএর ছাড়পত্রের অপেক্ষায় থাকা আবেদনের সংখ্যা হচ্ছে ৩ লাখ। এরমধ্যে গ্রীনকার্ডের আবেদনকারীও রয়েছেন।
ইমিগ্রেশনের কর্মকর্তারা দাবি করেছেন যে, নানা কারনে আবেদনকারীর মাত্র ১% এর সিটিজেনশিপ প্রদান করা হচ্ছে না। অবশিষ্ট ৯৯% বিলম্বে হলেও পাচ্ছেন। অপরদিকে ইমিগ্রেশন আইনজীবী এবং নিরপেক্ষভাবে পরিচালিত গবেষণা জরিপে উদঘাটিত হয়েছে যে, ২০০৭ সালে মোট ৮৯৬৮৩ জনের সিটিজেনশিপের আবেদন নাকচ করা হয়েছে। এ সংখ্যা হচ্ছে মোট আবেদনের ১২%। আবেদনকারীর ব্যাকগ্রাউন্ড চেক করার সময় নানা অসঙ্গতির তথ্য ফাঁস হওয়ার জন্যে এগুলো নাকচ করার পর সংশিস্নষ্টদেরকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে বহিষ্কারের পদক্ষেপ নেয়া হয়। ১৯২০ সালের পর আর কোন বছরেই এত অধিকসংখ্যক আবেদন নাকচ করা হয়নি বলেও সংশিস্নষ্টরা জানিয়েছেন। গবেষকরা বলেছেন, গ্রীণকার্ড পাবার পর উপরোক্ত ১২% এর সকলেই প্রায় বিধিসম্মত জীবন-যাপন করেছেন। তবুও কেন তাদের আবেদন নাকচ করা হয়েছে সে ব্যাপারটি স্পষ্ট করে জানানো হচ্ছে না। উলেস্নখ্য যে, সিটিজেনশিপের আবেদন নাকচ করার অর্থ হচ্ছে গ্রীণকার্ড বাতিল হয়ে যাওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করা অনিশ্চিত হওয়া। কেননা এ ধরনের ডিপোর্টেশনের আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করে কোন লাভ হয়নি।
ব্র্যাড ডারনেল নামক একজন কানাডিয়ান ১৯৯১ সাল থেকে গ্রীণকার্ড নিয়ে বসবাস করছেন ক্যালিফোর্নিয়ায়। বিয়ে করেছেন আমেরিকানকে। আমেরিকায় জন্মগ্রহণকারী দুটি পুত্র সন্তানও রয়েছে তার। কিন্তু গত বছর যখন তিনি সিটিজেনশিপের আবেদন করেন সে সময় বুঝতে পারেন যে ১০ বছর আগে সাবেক এক গার্লফ্রেন্ডের সাথে দুর্ববহারের জন্যে তার সামান্য শাস্তি হয়েছিল। তবে পরবতিতে তা পাবলিক রেকর্ড থেকে অপসারণ করা হয়েছিল। এতদসত্বেও সিটিজেনশিপের আবেদন গ্রহণ করা হয়নি। এখন তার আমেরিকায় বসবাসের স্বপ্ন ধুলিসাত হতে চলেছে। ১৬ বছরের অধিক সময় গ্রীণকার্ড নিয়ে বসবাসের পর কেন যে তিনি সিটিজেনশিপের জন্যে আবেদন করেছিলেন-তা এখন তিলে তিলে উপলব্ধি করছেন বলে নিউইয়র্ক টাইমসে প্রকাশিত এক প্রতিবদনে উলেস্নখ করা হয়েছে। উলেস্নখ্য যে, ১৯৯৬ সালে প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনের আমলে তৈরী ইমিগ্রেশনের একটি আইন অনুযায়ী মামুলী অপরাধে শাস্তিভোগকারীদের গ্রীণকার্ডই শুধু কেড়ে নেয়ার বিধান করা হয়নি, একইসাথে সিটিজেনশিপ প্রদানের উপরও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। এরফরে প্রতি বছর গড়ে ৮৫ হাজার ইমিগ্র্যান্টের সিটিজেনশিপ গ্রহনের আকাঙ্খা নস্যাৎ হয়ে যাবার সাথে সাথে আমেরিকায় বসবাসের সুযোগটিও ফুরিয়ে যাচ্ছে। এ ধরনের মামুলি কারণে সিটিজেনশিপের আবেদন নাকচ এবং গ্রীণকার্ড বাতিলের সবচেয়ে বেশী ঘটনা ঘটেছে ২০০০ সালে। মোট ৩ লাখ ৯৯ হাজার ৬৭০ জনের আবেদন নাকচ করা হয় ঐ বছর। আর সে সংখ্যা ছিল মোট আবেদনের এক তৃতীয়াংশ। এসব তথ্য জানা গেছে মাইগ্রেশন পলিসি ইন্সটিটিউট থেকে।
সিটিজেনশিপের জন্যে আবেদনকারীরা কী ধরনের পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছেন তার উদাহরন দিতে গিয়ে নিউইয়র্ক টাইমস ফ্লোরিডার ৩টি ঘটনা বিবৃত করেছে। ভোটাধিকার হচ্ছে মূল টার্গেট সিটিজেনশিপ গ্রহনের এবং আবেদনের সময় নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে জড়িত থাকার তথ্য প্রকাশ করায় একজনের আবেদনই শুধু বাতিল করা হয়নি সাথে সাথে তাকে অবিলম্বে যুক্তরাষ্ট্র ত্যাগের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ ধরনের নির্দেশপ্রাপ্তদের আইনজীবী জেফরী ব্রওয়্যারমেন এ তথ্য জানিয়েছেন।
যুক্তরাজ্যে জন্মগ্রহণকারী একজন ব্যবসায়ীর সিটিজেনশিপের আবেদন নাকচ করার সাথে সাথে তাকে গ্রেফতার করে ডিটেনশন সেন্টারে পাঠানোহ হয়েছে অতি সম্প্রতি। তার অপরাধ হচ্ছে তিনি ঠিকানা পরিবতনের তথ্য যথাসময়ে ইমিগ্রেশন বিভাগকে অবহিত করেননি। আর এ তথ্য উদঘাটিত হয় ইমিগ্রেশন এজেন্সী প্রেরিত একটি নোটিশের জবাব না দেয়ায়। নোটিশটিতে ভুলবশতঃ তাকে গুরুতর অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।
ইলিনয় স্টেটের আরেকটি ঘটনা-যা সম্প্রতি কংগ্রেসেরও দৃষ্টি কাড়তে সক্ষম হয়েছে। ক্রোয়েশিয়ার ইমিগ্র্যান্ট ম্যারিন টারকিনভিকের সিটিজেনশিপের আবেদন পরপর দু’বার নাকচ হয়। কারণ তিনি টিপসই প্রদান করেননি। টিপসই নেয়ার কথা ইমিগ্রেশন অফিসেই। কারণ তিনি অসুস্থ এবং বাসার বাইরে বের হওয়ার কোন যোগ্যতা তার নেই। সিটিজেনশিপের আবেদন পেন্ডিং থাকাবস্থায় ২০০৪ সালের এপ্রিলে তিনি পরলোকগমন করেন। এরফলে তার স্ত্রী পড়েছেন বিপদে। ফ্রান্সের নাগরিক হিসেবে তিনি বিয়ে করেছিলেন ম্যারিন টারকিনভিকে। সিটিজেনশিপ গ্রহনের পর স্ত্রীকে স্পন্সর করবেন ভেবেছিলেন মিঃ ম্যারিন টারকিনভিকে। এ ঘটনাটি হাউজে উত্থাপন করে বিল উঠিয়েছেন ইলিনয়ের ডেমক্র্যাট কংগ্রেসম্যান ডেনিয়েল লিপিনস্কি। বিলটি পেন্ডিং রয়েছে বিধায় মিসেস ম্যারিন টারকিনভিকের ডিপোর্টেশনের নির্দেশ স্থগিত রাখা হয়েছে।
ইমিগ্রেশনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সিটিজেনশিপের আবেদন বেড়েছে। এজন্যে নাকচের হারও বেড়েই চলেছে। ১৯৯৬ সালে সবচেয়ে বেশী ইমিগ্র্যান্ট সিটিজেন হিসেবে শপথ নিয়েছেন। সে সংখ্যা ছিল ১০ লাখ। ১৯৯৭ সাল থেকে ২০০৭ সালের প্রতি বছরই গড়ে ৪ লাখ ৫০ হাজার ইমিগ্র্যান্ট শপথ নিয়েছেন সিটিজেন হিসেবে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ইন্টারভিউ দেয়ার সময় যারা সাধারণ জ্ঞানের পরিক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেন না বা প্রয়োজনীয় ডক্যুমেন্ট প্রদানে সক্ষম হন না তারা অবশ্য পুনরায় আবেদনের সুযোগ পান। কিন্তু যারা জালিয়াতি বা অন্য কোন অপরাধের জন্যে চিহ্নিত হন তারাই পড়ছেন বিপদে।
Bangla Community News Tags: ইমিগ্রেশন, ইমিগ্র্যান্ট, নিউইয়র্ক, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য
Evergreen Bangla Community


Post Your Comments