নিউইয়র্ক প্রেসক্লাবের টাউন হল মিটিংয়ে মেনন ও মঞ্জু
নিউইয়র্ক প্রেসক্লাবের টাউন হল মিটিংয়ে মেনন ও মঞ্জু বলেন শেখ হাসিনা এবং বেগম জিয়াকে জেলে রেখে সংলাপ কখনোই সফল হবে না
নিউইয়র্ক থেকে এনাঃ নিউইয়র্কে ‘আমেরিকা-বাংলাদেশ প্রেসক্লাব’ আয়োজিত টাউন হল মিটিংয়ে বক্তৃতাকালে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির চেয়ারম্যান রাশেদ খান মেনন বলেছেন যে, ১/১১ হঠাৎ করে আসেনি, এটি পূর্বকল্পিত। সুশাসনের নামে আন্তর্জাতিক সংস্থা পাশ্চাত্যের অনুগত লোকদের রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করার জন্যে অপপ্রচার চালিয়েছে যে বাংলাদেশ নামক ট্রেনটি লাইনচ্যুত হয়েছিল। প্রকৃত অর্থে লাইনচ্যুত হয়নি, ট্রেনটিকে দুর্ঘটনায় ফেলা হয়েছিল। তাই ১/১১ এর পরিবর্তনের বিষয়টি সঠিকভাবে উপলব্ধি করতে হবে আমাদের সকলকে। একই সভায় সাবেক মন্ত্রী জাপা (মঞ্জু) চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেছেন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান সংহত হতে পারেনি রাজনীতিকদের মধ্যে পারস্পরিক সহমর্মিতাবোধ না থাকায়। আজকের পরিস্থিতির জন্যে আমরা সকলেই সমানভাবে দায়ী। তিনি বলেন, নব্বইয়ের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে বিজয় অর্জনের পর গঠিত জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনেই গণতন্ত্রের জন্যে জীবন দিতে প্রস্তুত এমপিগণ একটি বিল পাশ করেন। সেই বিলে বলা হয়েছে, দলের বিরুদ্ধে যিনি কথা বলবেন বা ভোট দেবেন তার সংসদ সদস্য পদ সাথে সাথে বাতিল হয়ে যাবে। জনাব মঞ্জু বলেন, স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের সুফল এভাবেই নব্য স্বৈরাচারের কবলে পড়ে এবং তার পরিণতি আজকের বাংলাদেশ। জনাব মঞ্জু বলেন, তবুও আমি হতাশ নই। পাকিস্তান, মিশর, ফিলিস্তিন, লেবাননের জনসাধারণের মনোভাব নিশ্চয়ই আমাদেরকে সাহস যোগাচ্ছে। জনাব মেনন এবং জনাব মঞ্জু সমস্বরে বলেন যে, শেখ হাসিনা এবং বেগম জিয়াকে জেলে রেখে সংলাপ কখনোই সফল করা যাবে না। দেশের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের স্বার্থে তাদের উভয়কেই মুক্তি দেয়া উচিত। তাঁরা দুজনেই যুদ্ধাপরাধীদের বিচারেও একমত পোষণ করেছেন। মানবাধিকারের স্বার্থে এবং ভবিষ্যতে রাজনৈতিক হত্যাযজ্ঞ রোধের স্বার্থে যুদ্ধাপরাধীদের চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিকল্প নেই।
১৯ এপ্রিল বাংলাদেশ সময় রোববার সকালে নিউইয়র্ক সিটির এস্টোরিয়ায় ক্লাব সনমে বাংলাদেশের চলমান পরিস্থিতির আলোকে অনুষ্ঠিত এ টাউন হল মিটিংয়ে সভাপতিত্ব করেন ‘আমেরিকা-বাংলাদেশ প্রেসক্লাব’র সভাপতি ও বার্তা সংস্থা এনা এবং ঠিকানার প্রেসিডেন্ট সাঈদ-উর রব এবং উপস্থাপন করেন কর্মরত প্রেসক্লাবের নির্বাহী সদস্য পরিচয় সম্পাদক নাজমুল আহসান। অনুষ্ঠানের মঞ্চে উপবেশন করেন পেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক দর্পণ কবীর, এনা সম্পাদক লাবলু আনসার, ঠিকানা সম্পাদক মুহম্মদ ফজলুর রহমান এবং এখন সময় সম্পাদক কাজী শামসুল হক। স্বাগত বক্তব্য রাখেন দর্পণ কবীর এবং সমাপনী বক্তব্যের আগে দুই অতিথি রাজনীতিককে শুভেচ্ছার নিদর্শন হস্তান্তর করেন সাঈদ-উর রব। অনুষ্ঠানে কম্যুনিটির সর্বস্তরে প্রতিনিধিত্বকারী নেতৃবৃন্দ ও বিভিন্ন পত্রিকা, টিভি, রেডিওতে কর্মরত সাংবাদিকরা। মুক্তিযোদ্ধাদের উপস্থিতি ছিল উলেস্নখ করার মত। যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগ, যুক্তরাষ্ট্র বিএনপি, যুক্তরাষ্ট্র জাসদ, যুক্তরাষ্ট্র জাতীয় পার্টি উভয় গ্রম্নপের নেতৃবৃন্দও অংশ নেন এ মিটিংয়ে। রাশেদ খান মেনন এবং আনোয়ার হোসেন মঞ্জু উপস্থিত দর্শকদের প্রশ্নের জবাবও দিয়েছেন। ৩ ঘন্টাব্যাপী এ অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের ১/১১ এর পূর্ববর্তি পরিস্থিতি, বর্তমান পরিস্থিতি, খাদ্য সংকট, দুর্নীতি বিরোধী অভিযান, বিশেষ আইন, সাবেক দুই প্রধানমন্ত্রীকে গ্রেফতার, নির্বাচন কমিশন, দুর্নীতি দমন কমিশনের সংস্কার, বিচার বিভাগকে প্রশাসন থেকে পৃথকীকরণ, মানবাধিকার কাউন্সিল গঠন, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ইত্যাদি স্থান পায়। রাশেদ খান মেনন প্রাঞ্জল ভাষায় ১/১১ এর প্রেক্ষাপট উপস্থাপন করেন। তিনি বলেন, সে সময় আমেরিকা, বৃটিশ, ভারতের হাই কমিশনার এবং রাষ্ট্রদূতদের ভূমিকার প্রতি গভীরভাবে দৃষ্টিপাত করলেই স্পষ্ট হবে যে ১/১১ হঠাৎ করে আসেনি। সেটি এসেছে পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী। তিনি বলেন, দুর্নীতি এবং রাজনীতিকে এক করে ফেলা হচ্ছে বাংলাদেশ থেকে রাজনীতিকে দূরে সরিয়ে রাখার অভিপ্রায়ে। কিন্তু অতীতের মত এবারও তা সম্ভব হবে না। রাশেদ খান মেনন বলেন, দেশ এবং প্রবাসে সর্বত্র একটি প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছি, তা হচ্ছে নির্বাচন ডিসেম্বরের মধ্যে হবে তো? তিনি বলেন, খাদ্যদ্রব্যের মূল্য সারাবিশ্বে বেড়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের মত বৃদ্ধি পায়নি। এছাড়া বাংলাদেশে উৎপাদিত অনেক পণ্যের দামও আকাশচুম্বি হয়েছে। এর অর্থ কি? আসলে সরকারে যারা রয়েছেন তারা পরিস্থিতি মোকাবেলায় আগে থেকে প্রস্তুত ছিলেন না। এজন্যে সরকারের সাথে যুক্ত লোকজনেরা একেকজন একেক রকমের তথ্য দিচ্ছেন খাদ্য মজুদ ও বাজার ব্যবস্থাপনার ব্যাপারে। রাশেদ খান মেনন বলেন, জাতিসংঘ থেকে নাকি একটি চিঠি দেয়া হয়েছিল বাংলাদেশে এবং সে চিঠির পরিপ্রেক্ষিতেই ১/১১তে গঠিত কেয়ারটেকার সরকারের সকল কাজে সেনাবাহিনী সহায়ক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। কিন্তু সে চিঠি কে দিয়েছিলেন তা এখন জাতিসংঘ সদর দফতরের কেউই জানেন না। তিনি প্রশ্ন রাখেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে বিভিন্ন সেক্টরে অভিযান চালানো হচ্ছে। কিন্তু জাতীয় প্রতিরক্ষা ক্রয় বিভাগের ব্যাপারে দুর্নীতি দমন কমিশন উচ্চবাচ্য করছে না কেন? তিনি বলেন, আমরা অবাধ ও নিরপেক্ষ পরিবেশে সঠিক ভোটার তালিকার মাধ্যমে সুন্দর একটি নির্বাচন চেয়েছিলাম। কিন্তু সে নির্বাচনের পরিবেশ তৈরীতে কেয়ারটেকার সরকারের আন্তকা নিয়ে এখন আবারো প্রশ্নের উদ্রেক হয়েছে জনমনে। রাশেদ খান মেনন বলেন, আমরা কেউই নিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক ব্যবস্থায় চলতে চাই না, অনুগত জাতীয় সংসদও কাম্য নয়। তিনি বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি থেকে জাতিকে উদ্ধারের একমাত্র উপায় হচ্ছে নির্বাচন, আর সে নির্বাচন নিয়ে যদি পুনরায় জনমনে সন্দেহ-সংশয় দেখা দেয় তাহলে উত্তরণের পথ ততটা সহজ হবে না।
আনোয়ার হোসেন মঞ্জু বলেন, পাকিস্তান আমলে বিদেশীরা আমাদেরকে রাজনীতি শিখাতোর ঔদ্ধত্য দেখিয়েছে, এখন সেটা করতে চাচ্ছে দেশী ছেলেরা। কিন্তু এটা ভুলে গেলে চলবে না যে বাংলাদেশের মানুষ বারবারই রুখে দাঁড়িয়েছেন অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে। তিনি বলেন, জাতিসংঘের চিঠির দোহাই দিয়ে ১/১১ এর পরবর্তি সরকার পরিচালনায় সেনাবাহিনী সহায়তা করছে। কিন্তু সেই চিঠির হদিস এখন কেউ পাচ্ছেন না। কে দিয়েছে সে চিঠি? তিনি বলেন, আজ বলতে দ্বিধা নেই যে, বর্তমান বিশ্বের গুরুর কথা না শুনলে বোমা খেতে হয়। তিনি আরো বলেন, আমি দেশ ছেড়ে আমেরিকায় রয়েছি, এটা সরকারের জন্যে নয়, অন্য কারণ রয়েছে। দৈনিক ইত্তেফাকের প্রসঙ্গ জানতে চাইলে মঞ্জু বলেন, আমি আইনের লোক নই, তাই আমি আইন না বুঝে লংঘনের কারণ হতে পারি। কিন্তু যারা আইনের লোক তারা কীভাবে তা লংঘন করেন? আইনের লোক যদি তা লংঘন করে তাহলে তার কী শাস্তি হওয়া উচিত? তিনি আরো বলেন, দুর্নীতির বিচারের জন্যে প্রচলিত আইনই যথেষ্ঠ। বিশেষ আইনের বিচারকে কখনোই জনগণ মানবে না। এরফলে সত্যিকারের দুর্নীতিবাজরাও এখ সময় পার পেয়ে যাবে বলে উলেস্নখ করেন জনাব মঞ্জু। কেয়ারটেকার সরকারের প্রতি তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, রাজনীতিকদের প্রতি আপনাদের এত ক্ষোভের কারণ কি?
প্রসঙ্গত উলেস্নখ্য যে, ইতিপূর্বে কানাডার মানবাধিকার আইনজীবী উইলিয়াম সেস্নান বলেছিলেন যে, ১/১১ হঠাৎ করে আসেনি, এটি ছিল পূর্ব পরিকল্পিত। আমি ২০০৫ সালে ঢাকা সফরের সময় একজন এমপি এবং দৈনিক পত্রিকার একজন সম্পাদকের মুখে ১/১১ সম্পর্কে শুনেছি। কানাডার এটর্নীর এ বক্তব্যের পরিপূরক বক্তব্য দিলেন রাশেদ খান মেনন।
Bangla Community News Tags: আওয়ামী লীগ, এস্টোরিয়া, কানাডা, জাতিসংঘ, দৈনিক ইত্তেফাক, নিউইয়র্ক, বিএনপি, মুক্তিযোদ্ধা, যুদ্ধাপরাধী, শেখ হাসিনা
Evergreen Bangla Community


Post Your Comments