শ্যাওলা থেকে জ্বালানীর বিকল্প আবিষ্কারে বাংলাদেশীর কৃতিত্ব
নিউইয়র্ক থেকে এনাঃ জ্বালানীর বিকল্প হিসেবে গম ভূট্টা, যব থেকে ইথানল উৎপাদনের ফলে প্রচুর খাদ্য ধ্বংস করা হচ্ছে। এজন্যে আবাদি জমি ব্যবহৃত হচ্ছে জ্বালানী উৎস হিসেবে। শ্রম-অর্থও ব্যয় হচ্ছে বিপুল পরিমাণে। সাথে পরিবেশও দুষণ মুক্ত রাখা সম্ভব হচ্ছে না। এহেন অবস্থা থেকে মানব সম্প্রদায়কে অব্যাহতি প্রদানের অভিপ্রায়ে গবেষণা শুরু করেছিলেন বিশ্বের সেরা বিজ্ঞানীদের একটি দল। সাধনায় কি না হয়-তারই প্রমান হাজির করলেন এ বিজ্ঞানী দলটি শ্যাওলা বা শৈবাল থেকে ইথানলের বিকল্প তেল তৈরীর মাধ্যমে। এজন্যে প্রয়োজন হচ্ছে শুধুমাত্র সূয্যের আলো আর বাতাস। শ্যাওলা থেকে তেল তৈরীর পদ্ধতিকে ব্যাপকভাবে ব্যবহারের জন্যে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের অনুমতি চাওয়া হয়েছে। অনুমতি পেতে সময় লাগবে বছারাধিককাল। এরই মধ্যে বিজ্ঞানী দলটি ঐ তেল বা বায়ুফুয়েল যে জ্বালানীর বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করা যায় তার পরীক্ষা সাফল্যজনকভাবে চালাচ্ছে। এ গবেষণার উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছে আমেরিকার শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্র এবং টিভিগুলো। প্রতিটি সংবাদে গবেষণার টিম লিডার হিসেবে বাংলাদেশী বিজ্ঞানী ডঃ আতাউল করিমের প্রশংসাও স্থান পেয়েছে। বিজ্ঞানের যুগে সভ্যতা এগিয়ে চলার ক্ষেত্রে জ্বালানীর বিকল্প নেই এবং সে জ্বালানী উৎপন্ন হবে পরিবেশ সুরক্ষার গ্যারান্টিতে-এর চেয়ে বড় কাজ আর কী হতে পারে-এমন অভিমতও পোষণ করা হয়েছে কোন কোন মিডিয়ায়।
শ্যাওলা যে কোন জলাশয়ে উৎপাদন করা সম্ভব। এজন্যে নতুন কোন অর্থ বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে না, শ্রমশক্তির দরকারও হবে অনেক কম। গম, ভুট্টা বা যবের জন্যে বিপুল জমি দরকার হবে এবং সে জমিতে শস্য উৎপাদনে ব্যয় হবে প্রচুর অর্থ। মানুষের খাদ্যকে নষ্ট করে ইথানল তৈরীর এ ধারণাটি আধুনিক হলেও বাস্তবতা বিবর্জিত বলে মনে করেন বিজ্ঞানীরা। আর এ বিজ্ঞানী দলের নেতৃত্ব দেন একজন বাংলাদেশী। তার নাম ডঃ আতাউল করিম। বিশ্বের ১০১ জন সেরা বিজ্ঞানীর একজন হিসেবে ইতিমধ্যেই পরিচিতি পেয়েছেন। ভার্জিনিয়ায় ওল্ড ডমিনিয়ান ইউনিভার্সিটির গবেষণা বিভাগের প্রধান ডঃ আতাউল করিম শ্যাওলা বা শৈবাল থেকে বায়োফুয়েল আবিষ্কারের তথ্যের কথা স্বীকার করে বার্তা সংস্থা এনাকে ৮ এপ্রিল জানিয়েছেন, প্যাটেন্টটির অনুমোদনের জন্যে যথাযথ কর্তৃপক্ষ সমীপে জমা দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, জলাশয় বা অন্যকোন খাল-বিলে শ্যাওলা উৎপাদনের পাশাপাশি বিশেষ ধরনের ট্যাংকের মাধ্যমেও তা জন্মানো যায়। যেভানে রোদ আর বাতাশ প্রবাহিত হচ্ছে সেখানেই শ্যাওলা জন্মাবে। এটার কোন শেষ নেই। তাই জ্বালানীর চাহিদা মেটানোর জন্যে আমাদের এ উদ্ধাভন সভ্যতার অগ্রসরমানতায় মানবতার কল্যাণে বিশেষ অবদান রাখবে বলে মনে করছি। ডঃ আতাউল করিম বলেন, কয়লা, পেট্রলিয়াম ইত্যাদির সংমিশ্রনে ফসিল ওয়েল তৈরী করা হচ্ছে। সম্প্রতি ভূট্টা, গম বা যব থেকে ইথানল তৈরীর পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। কিন্তু ইথানলের জন্যে মানুষের খাদ্য ধ্বংস হচ্ছে। ব্যয় হচ্ছে প্রচুর অর্থ। তিনি বলেন, আমাদের শ্যাওলার জন্যে তেমন কোন ব্যয় হবে না। গম, ভুট্টা বা যব থেকে ইথানল উৎপাদনে যত ব্যয় হচ্ছে তার চেয়ে ৪০ গুণ কম ব্যয় হবে শ্যাওলা থেকে জ্বালানী উৎপাদনে। কৃষি জমিও মানুষের খাদ্যের জন্যেই ব্যবহৃত হবে। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, পরিবেশ সুরক্ষায় আমাদের উদ্ভাবনটি অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালনে সক্ষম হবে বলে গবেষণায় প্রতিয়মান হয়েছে।
বিশ্বে জ্বালানীর চাহিদা বৃদ্ধির সাথে সঙ্গতি রেখে উৎপাদন নিয়ে সমস্যা দেখা দিয়েছে। এছাড়া প্রচলিত জ্বালানীর ফলে পরিবেশ দুর্ষণের শিকার হচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। সর্বোপরি জ্বালানীর মূল্য বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে স্বল্প ব্যয়ে সহজে উৎপাদনযোগ্য এবং তুলনামূলকভাবে শ্রেয়তর পরিবেশ-বান্ধব এলজী তথা শ্যাওলা থেকে বায়োফুয়েল তৈরীর বাস্তôবতা নিঃসন্দেহে মানবতার জন্যে সুসংবাদই বয়ে এনেছে।
নেতৃত্বদানকারী বিজ্ঞানী ডঃ আতাউল করিম হচ্ছেন ভার্জিনিয়ার নরফোকে অবস্থিত এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস প্রেসিডেন্ট (গবেষণা)। তাঁর সাথে এ গবেষণা টিমে রয়েছেন ডঃ মারগি মূলহল্যান্ড, ডঃ হ্যারল্ড জি মারশাল, ডঃ এন্ড্রু এস গর্ডন, গ্যারী এস স্যাফ্রান, জেমস ডব্লিউ উইলসন, প্যাট্রিক জি হ্যাচার, রবার্ট এল এ্যাশ, হ্যান পি বাও এবং এ্যারন স্টুবিন্স। নিজ মেধা, সৃজনশীলতা ও কর্মোদ্যম গুণে সুখ্যাত ও সুপরিচিত ডঃ আতাউল করিম এর আগে দ্রম্নদগামী ট্রেন তৈরীর রেকর্ডও সৃষ্টি করেছেন। তিনি বলেন, আমার গবেষণা বিভাগের ক্রমবর্ধিষ্ণু একটি সংখ্যা ১৭০টিরও অধিক জার্ণালের সম্পাদকীয় বিভাগের সাথে সক্রিয় রয়েছেন। তার মধ্যে নির্বাচিত ফেলো রয়েছেন ৫১ জন। তবে বায়োডিজেল গবেষণায় রত আছেন উপরোক্ত ৮ জন।
ডঃ করিম বলেন, জীবাষ্ম বা ফসিল থেকে উৎপন্ন জ্বালানীর উপর অতি-নির্ভরশীলতা বজায় রাখা সম্ভব নয়। উপরন্তু পরিবেশ, অর্থনীতি এবং জাতীয় নিরাপত্তার প্রতি এটা এককভাবেই সর্ববৃহৎ একটি হুমকিস্বরূপ। গ্রীণহাউস গ্যাস প্রবাহ এবং বৈশ্বিক উষ্ণতার উপর ফসিল ফুয়েলের কেন্দ্রিক ভূমিকা লক্ষ্য করেই বিশেষ গুরুত্বসহ বিকল্প সোর্স হিসেবে নন-ফসিল ফুয়েল এনার্জির উপর গবেষণা নবউদ্যমে শুরু করা হয়। প্রযুক্তিগত এবং অর্থনৈতিক সমাধান অর্জন তথা ফসিল ফুয়েলের এনার্জি প্রাপ্তির লক্ষ্যে মৌল এবং প্রায়োগিক গবেষণা অপরিহার্য হয়ে পড়ে। সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে ভার্জিনিয়া স্টেটে ভার্জিনিয়া কোস্টাল এনার্জি রিসার্চ কনসর্টিয়াম গঠন করে এবং এই কনসর্টিয়ামের পরিচালনায় নেতৃত্ব দিচ্ছে ওল্ড ডমিনিয়ন ইউনিভার্সিটি। এছাড়া আরো কয়েকটি ইউনিভার্সিটি এর সাথে কাজ করছে। সেগুলো হচ্ছে ভার্জিনিয়া টেক, ভার্জিনিয়া ইন্সটিটিউট অব মেরিন সায়েন্স, নরফোক স্টেট ইউনিভার্সিটি, জেমস মেডিসন ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব ভার্জিনিয়া, ভার্জিনিয়া কমনওয়েল্্থ ইউনিভার্সিটি এবং হ্যাম্পটন ইউনিভার্সিটি। বিকল্প জ্বালানীর গবেষণা ও উন্নয়ন কাজে নিযুক্ত সমগ্র স্টেটে আন্তঃ বিশ্ববিদ্যালয় নেটওয়ার্ক স্থানীয় কর্মসংস্থান, ম্যানুফ্যাকচারিং গ্রম্নপ, স্টেটের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, ভার্জিনিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়সমূহের ছাত্র-ছাত্রী-কর্মচারি এবং সাধারণ মানুষের উপকারে আসবে বলে সংশি্নষ্টরা মনে করছেন। তারা আরো মনে করেন, ভার্জিনিয়ার বিশাল উপকূলীয় এলাকা, প্রাকৃতিক জলপথ, সূর্য রশ্মির প্রাচুর্য, একাধিক বিকল্প জ্বালানীর আদর্শ সূত্র হওয়ার যোগ্যতা রাখে।
ব্যক্তিগতভাবে ডঃ আতাউল করিম খুবই অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। দু’সপ্তাহ আগে ভার্জিনিয়াস্থ একটি হাসপাতালে তার পীঠে অস্ত্রোপচার হয়েছে। বর্তমানে তিনি পূর্ণ বিশ্রামে রয়েছেন। স্বাভাবিকভাবে কথাও বলতে পারেন না। এতদসত্বেও বার্তা সংস্থার ফোন পেয়ে তিনি কথা বলেছেন। জানিয়েছেন এ গবেষণার উদ্যোগ গ্রহনের বিস্তারিত তথ্য। তিনি তাঁর গবেষণা টিমের ব্যাপারেও অত্যন্ত আশাবাদি। এরা বুদ্ধিবৃত্তি পুঁজি তৈরী করে বর্তমানের সমস্যা মোকাবেলা করা, জীবনের মান উন্নয়ন করা থেকে শুরু করে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬টি কলেজে আর এন্ড ডি সচল রাখার মত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির চাকা তৈরী করছেন বলে জানান। ডঃ করিম জানান, তার বিশ্ববিদ্যালয় গত অর্থ বছরে আর এন্ড ডি খাতে ব্যয় করেছে ৭৩.৬ মিলিয়ন ডলার। ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশন সমপর্যায়ের কর্মসূচির শীর্ষতম ১০০টির মধ্যে তার বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মসূচিকে ১৩তম স্থান দেয়। ওল্ড ডমিনিয়ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা কর্মসূচি জাতীয় পর্যায়ে মেডিক্যাল স্কুলের সাথে যুক্ত নয় এমন প্রতিষ্ঠানসমূহ, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এবং নাসার গবেষণা কর্মসূচির মধ্যে যথাক্রমে ৭১, ৬৭ এবং ৫০তম স্থান অর্জন করে বলে ডঃ করিম জানিয়েছেন।
Bangla Community News Tags: নিউইয়র্ক
Evergreen Bangla Community



Post Your Comments