কেয়ারটেকার সরকারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ক্রিমিনাল কোর্টে মামলার খবরটি ডাহা মিথ্যা
নেদারল্যান্ডের হেগে অবস্থিত আন্তর্জাতিক ক্রিমিনাল কোর্টে বাংলাদেশের কেয়ারটেকার সরকারের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের সংবাদটির কোন সত্যতা পাওয়া যায়নি। সেটি শুধুমাত্র চমক সৃষ্টির জন্যে করা হতে পারে-এর বেশী কিছু নয় বলে মন্তব্য করেছেন ঐ কোর্টের একজন আইনজীবী। বগুড়ার কুখ্যাত এক চোরকে থানায় ঝুলিয়ে পেটানোর ছবিকে বিএনপির নেতা তারেক রহমানের ছবি হিসেবে প্রচারের মাধ্যমে প্রকারান্তরে বিশ্বব্যাপী তারেক মুক্তি আন্দোলনের পিঠেই কৌশলে ছুরিকাঘাতের মত ক্রিমিনাল কোর্টে মামলা দায়েরের ঘটনাটিও সত্যিকার অর্থে চলমান আন্দোলনকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে বলে মনে করেন বিদগ্ধজনেরা। একইভাবে ইতিপূর্বে আমেরিকা ও কানাডায় গড়ে উঠা বিবৃতিসর্বস্ব কয়েকটি সংগঠনের পক্ষ থেকেও ঢাকঢোল পিটানো হয়েছিল যে তারা লবিয়িং ফার্ম নিয়োগ করছেন খালেদা-তারেকসহ রাজবন্দিদের মুক্ত করার জন্য। কিন্তু বছর পেরিয়ে যাচ্ছে তেমন কোন কাজ সত্যিকার অর্থে সংশি্নষ্ট সংগঠনগুলো করেছে বলে জানা যায়নি। শুধু তাই নয়, আন্তর্জাতিক সম্মেলনের নামে অনুষ্ঠান করে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনের কর্মকর্তাদের হাজির করার একটি হাস্যকর নাটকও কম্যুনিটি প্রত্যক্ষ করেছে। এরফলে কারাবন্দি খালেদা জিয়া, তারেক রহমানকে হয়তো সন্তুষ্ট করা সম্ভব হচ্ছে, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে বলে কেউই মনে করেন না। অধিকন্তু সত্যিকার অর্থে যারা কাজ করছেন বা লবিং ফার্ম নিয়োগ করেছেন তাদেরকে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে অভিযোগ উঠেছে। জাপানের দারাদ আহমদ কর্তৃক আন্তর্জাতিক ক্রিমিনাল কোর্টে মামলা দায়েরের খবরটি ঢাকার কয়েকটি দৈনিকে প্রকাশিত হওয়ার পর নিউইয়র্কে বার্তা সংস্থা এনা অফিসে অনেকে ফোন করেন। তারা কৌতুহল প্রকাশ করেন বিষয়টি জানার জন্যে এবং কেউ কেউ ঐ মামলা পরিচালনায় আর্থিক সহায়তার ব্যাপারেও আগ্রহ প্রকাশ করেন। একইসাথে ঐ কোর্টে কর্মরতরাও সন্দেহ পোষণ করেন খবরটি সম্পর্কে। এরপরই এনার পক্ষ থেকে হেগ, জাপান, জাতিসংঘে বিভিন্ন দফতর এবং জাপান বিএনপি ও কেন্দ্রীয় বিএনপির আন্তর্জাতিক বিষয়ক কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করা হয়। বেশ কয়েকদফা চেষ্টা করা হয় কথিত মামলার বাদি দারাদ আহমদের সাথে কথা বলার জন্য। তার ফোনে মেসেজ রাখা হয়। তার সহকর্মী হিসেবে পরিচয়দানকারী আবুল কাশেম নামক একজন কলব্যাক করেছিলেন গত সপ্তাহে। তিনি বলেছিলেন যে দারাদ আহমদ নিউইয়র্কে যাচ্ছেন মিডিয়ার সাথে মামলার ব্যাপারে কথা বলার জন্যে। কিন্তু দারাদ আহমদ ২২ জানুয়ারি রাত পর্যন্ত নিউইয়র্কে এসেছেন বলে জানা যায়নি কিংবা অন্য কোন স্থান থেকে কলব্যাক করেননি। জাপান বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি মোস্তাফিজুর রহমান বাবুলসহ কয়েকজন ফোনে এনাকে জানিয়েছেন যে, দারাদ আহমদ বিএনপির প্রাথমিক সদস্যও নন, অথচ প্রকাশিত খবরে নিজেকে সাংস্কৃতিক সম্পাদক দাবি করেছেন। জনাব বাবুল আরো জানিয়েছেন যে, দারাদ আহমদ এখানকার একটি রাশিয়ান ক্লাবের প্রচারপত্র বিলির কাজ করেন। জাপান রেডিওতে খন্দকালিন কাজের যে তথ্য সংবাদে ছাপা হয়েছে তা সঠিক নয় বলেও উলে্নখ করেন জনাব বাবুল। বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির আন্তর্জাতিক বিষয়ক প্রধান সমন্বয়কারী ও যুক্তরাষ্ট্র বিএনপির সভাপতি আব্দুল লতিফ সম্রাট (যার নেতৃত্বে বহির্বিশ্বে খালেদা-তারেক মুক্তি আন্দোলনের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে) উপরোক্ত দারাদ আহমদের মামলা দায়ের সংক্রান্ত খবরকে ডাহা মিথ্যা বলে অভিহিত করেন। এটা কেবলই চমক সৃষ্টির জন্যে করা হয়েছে। এভাবে অপপ্রচারের মাধ্যমে সত্যিকার অর্থে যারা কাজ করছি তাদেরকে সন্দেহের মধ্যে ঠেলে দেয়া হচ্ছে। শুধু তাই নয়, খালেদা-তারেক মুক্তির আন্দোলনকেও কৌশলে প্রতিহত করা হচ্ছে। তিনি বলেন, তারেক রহমানকে রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতনের অভিযোগটি দিবালোকের মত সত্য হলেও বগুড়ার চোরের ছবিকে তারেক রহমানের ছবি বলে যারা প্রচার ও প্রকাশ করেছে তারা আন্তর্জাতিক মহলকে প্রকৃত ঘটনা সম্পর্কে দ্বিধায় ফেলে দিয়েছে। এটা সুগভীর ষড়যন্ত্রেরই একটি অংশ বলে আমি মনে করছি। এ ব্যাপারে বিএনপির নেতৃবৃন্দকে সজাগ থাকতে হবে।
হ্যাগে আন্তর্জাতিক ক্রিমিনাল কোর্টে কর্মরত আইনজ্ঞ এবং এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর দ্য ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্টের আহবায়ক ডঃ জিয়াউদ্দিন আহমেদ ২২ জানুয়ারি ব্রাসেল্্স থেকে এনাকে বলেছেন, রীতি অনুযায়ী বাংলাদেশ এই কোর্টের সদস্য নয় এবং সদস্য না হলে সে রাষ্ট্রের কোন ব্যাপারে নাক গলানোর অধিকার এ কোর্টের নেই। বাংলাদেশ শুধুমাত্র স্বাক্ষর করেছে ঐ কোর্টের সনদে কিন্তু প্রথা অনুযায়ী রেটিফিকেশন করেনি। এছাড়া এই কোর্টের ৫(১) (এ) ধারা অনুযায়ী বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে খুবই মারাত্মক ধরনের অপরাধ সংঘঠিত হয়নি যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে উদ্বিগ্ন করতে পারে। একইভাবে এমন কোন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়নি যে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন হয় এই কোর্টের মাধ্যমে বিচার প্রক্রিয়া শুরুর। কেননা যারা এ কোর্টের সদস্য নয় সে সব রাষ্ট্রের কোন ঘটনার বিচার করতে হলে নিরাপত্তা পরিষদের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক রেজ্যুলেশন করতে হয়। তিনি বলেন, ১৯৯৮ সালের ১৭ জুলাই রোমে জাতিসংঘের বিশেষ বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী গঠিত হয়েছে এই কোর্ট এবং ২০০২ সালের ১ জুলাই থেকে শুরু হয়েছে এর কার্যক্রম। বিশ্বে এটাই একমাত্র স্থায়ী কোর্ট। এই কোর্টের পঞ্চম ধারায় স্পষ্টভাবে উলে্নখ করা হয়েছে কী কী অপরাধে এই কোর্টে বিচার প্রার্থনা করা যায়। গণহত্যা, মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ, যুদ্ধাপরাধ এবং আগ্রাসন-এ ৪টি বিষয়কে নিদ্ধারণ করা হয়েছে। প্রথম ৩টির সংজ্ঞা নির্ণয় করা হলেও শেষের ‘আগ্রাসন’ সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যা এখনও দেয়া হয়নি। ডঃ জিয়াউদ্দিন বলেন, বাংলাদেশে উপরোক্ত কোন ব্যাপারেই মারাত্মক কোন পরিস্থিতির উদ্ভব হয়নি-যা আন্তর্জাতিক মহলকে উদ্বিগ্ন করে। তিনি বলেন, সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে বাংলাদেশ এ কোর্টের সদস্য বলে বিবেচিত হয়নি। তাই বাংলাদেশের কোন ব্যাপারে বিচার প্রার্থনার অবকাশও নেই। তবে কেউ এই কোর্টে ফ্যাক্সে বা ই-মেইলে অভিযোগ পাঠাতে পারেন অথবা দর্শনার্থী হিসেবে কোর্টে এসে মেইল বক্স অথবা অভ্যর্থনা কক্ষের কারো হাতে একটি দরন্স্ত ধরিয়ে দেয়ার অর্থ মামলা দায়ের করা নয়। ডঃ জিয়াউদ্দিন বলেন, ইরাকে হরদম মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হচ্ছে বলে হাজার হাজার অভিযোগ এসেছে কোর্টে। কিন্তু ইরাক যেহেতু এই কোর্টের সদস্য নয় এবং ইরাকের ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত আমেরিকাও সদস্য নয় এ কোর্টের-তাই কোন উদ্যোগ নেয়া সম্ভব হচ্ছে না। ডঃ জিয়া বলেন, সুদান এ কোর্টের সদস্য নয়। তবে সুদানের মামলা পরিচালনার অনুরোধ এসেছে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ থেকে।
দারাদ আহমদ কর্তৃক কেয়ারটেকার সরকারের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র হত্যার মামলা দায়ের সম্পর্কে প্রকাশিত সংবাদের ব্যাপারে মন্তব্য করতে বললে মৃদু হাসি দিয়ে ডঃ জিয়া বলেন, নিজের প্রচার চায় এমন লোকের পক্ষে এমন উদ্ভট তথ্য মিডিয়ায় পরিবেশন করা সহজ। তবে মিডিয়াগুলোকেও দায়িত্বশীল হতে হবে। একটি সরকারের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের কথা কেউ বললো এবং তারপরই সংবাদপত্রে তা প্রকাশ করার মধ্যে সত্যিকারের সাংবাদিকতার পরিচয় মেলে না। তথ্যটি সত্য কিনা তা পরীক্ষা করে দেখা উচিত ছিল। তাহলে এমন বিভ্রাট ঘটতো না। ডঃ জিয়া বলেন, তারেক রহমানকে ঝুলিয়ে পেটানোর ছবিটিও তেমনি একটি স্টানবাজি বলে আমি মনে করি।
দারাদ আহমদের বক্তব্য জানার জন্য সবশেষ ২২ জানুয়ারিও চেষ্টা করা হয় কিন্তু ফোনে তাকে পাওয়া যায়নি।
এদিকে বেগম জিয়া ও তারেক রহমানকে মুক্তির জন্যে কেয়ারটেকার সরকারের উপর আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টির জন্যে আমেরিকান লবিং ফার্ম নিয়োগের ঘোষণা দিয়েছিল নিউইয়র্কের আন্তর্জাতিক তারেক মুক্তি আন্তর্জাতিক পরিষদ নামক একটি সংগঠন। এরপর বেশ কয়েক মাস অতিবাহিত হয়েছে লবিং ফার্ম নিয়োগ করা হয়েছে বলে সংশি্নষ্টরা জানাননি। এই সংগঠনের কার্যক্রম এখন পর্যন্ত বিবৃতি এবং হোয়াইট হাউজ, স্টেট ডিপার্টমেন্ট ও ক্যাপিটল হিলের কর্মকর্তাদের কাছে স্মারকলিপি প্রদানের মধ্যেই সীমিত রয়েছে। কজের চেয়ে পদবী অধিক গুরুত্ব পায় এমন কতিপয় ব্যক্তি কর্তৃক গঠিত হয়েছে আরো কয়েকটি কমিটি-যারা প্রকৃত অর্থে বিএনপির সাথে সম্পৃক্ত। খালেদা-তারেকের মুক্তি আন্দোলনের জন্যে বিএনপির ব্যানারই সঠিক বলে অনেকে মনে করলেও ভিন্ন ভিন্ন ব্যানারের অর্থ হচ্ছে পদ আর পদবী। এছাড়া এমনও অভিযোগ রয়েছে যে, জিয়া পরিবারের প্রতি দুর্বলতাকে পুঁজি করে কম্যুনিটিতে নিরবে চাঁদাবাজির ঘটনাও ঘটছে। কেউ কেউ নাকি চাঁদার অর্থে দিনাতিপাত করছেন।
যুক্তরাষ্ট্রস্থ বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদী ফোরামের চেয়ারম্যান আনোয়ারুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে বলেছেন, তারেক রহমানের বন্ধু এবং আত্মীয়তার নাম ভাঙ্গিয়ে কেউ কেউ নানা অপপ্রচার চালাচ্ছে মুক্তি আন্দোলনকে নস্যাৎ করার জন্যে। কদিন আগে বগুড়ার জনৈক চোরকে পেটানোর ছবিকে তারেক রহমানের নামে টিভি ও কোন কোন মিডিয়ায় প্রচারের নেপথ্যেও রয়েছে ঐ শ্রেণীর কয়েকজন। এরা নিউইয়র্ক-যুক্তরাজ্য-ওয়াশিংটন ডিসির মধ্যে নেটওয়ার্ক করে ঐ জঘন্যতম অপকর্মটি সংঘঠিত করেছে। এরফলে আন্তর্জাতিক মহল বিভ্রান্ত হচ্ছেন। সত্যিকার অর্থে আমরা যারা রাজপথে রয়েছি, আন্তর্জাতিক মহলের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করছি-তাদের কথাও হয়তো সহজে তারা বিশ্বাস করতে চাইবেন না। জনাব আনোয়ার প্রশ্ন করেন, তাহলে ক্ষতিটা কার হচ্ছে? তিনি বলেন, ঐ জালিয়াতিপূর্ণ আচরণের মাধ্যমে আমাদের সকলের প্রিয় নেতা তারেক রহমানের ইমেজ বিনষ্টের ঘৃণ্য প্রয়াস চালানো হয়েছে। একইভাবে হেগে আন্তর্জাতিক ক্রিমিনাল কোর্টে মামলা দায়েরের মিথ্যা তথ্য প্রচার করেও আন্দোলনের পিঠে ছুরিকাঘাত করা হচ্ছে। দেশ ও বিদেশে বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদী আদর্শে বিশ্বাসীদেরকে এহেন চক্রের ব্যাপারে সজাগ থাকার আহবান জানিয়েছেন জনাব আনোয়ার।
সূত্রঃ এনা, নিউইয়র্ক।
Evergreen Bangla Community


Post Your Comments