দীপায়ন এর জন্য বাংলা একাডেমী অস্ট্রেলিয়ার ভালবাসা
দীপায়ন একটি সুন্দর ছেলের নাম। ডাক নাম দীপু। অস্ট্রেলিয়ায় পড়তে এসেছে বাংলাদেশ থেকে। নাটোরের ছেলে। বাবা ছিলেন প্রকৌশলী। গত বছর মারা যান ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে। একমাত্র ছোট বোনটি বাংলাদেশে। মা ছুটে এসেছেন দীপুকে দেখার জন্য। যাকে আমি চিনি না, জানিনা সময়ের আবর্তে সেই ছেলেটিকে এক মূহুর্তের জন্য মনে হয় একটি বাংলাদেশ। দুঃখ-কষ্ট অহর্নিশি আমাদের বাংলাদেশকে ঘিরে রয়েছে সর্বদাই। বাংলাদেশের মতো দীপায়নও সমস্যা সংকুল এক জীবনের সাথে যুদ্ধ করে চলেছে। সে যুদ্ধ মরণব্যাধি ক্যান্সারের সাথে। দীপায়নের শয্যা পাশে প্রথম যেদিন গিয়েছি, প্রথম দর্শনেই মন কেড়েছে ওর অমায়িক ব্যবহার আর ভাল লেগেছে ওর অমিত মুখের হাসি। মরণব্যাধি ক্যান্সারে আক্রান্ত তবু মুখে লেগে থাকা এক টুকরো হাসি বলে দেয় দীপায়ন ফুরিয়ে যাবার নয়। আর তাই মনের অজান্তেই বলে ফেলি সব সমবেদনার কথা। সত্যি বলতে কি একজন দীপায়নের সাথে কি ভাবে কথা বলবো ভেবে চিন্তে যাইনি দীপায়নের কাছে। গিয়েছি প্রবাস জীবনে একজন সংগঠকের দায়বদ্ধতা থেকে। বাংলা একাডেমী অস্ট্রেলিয়ার পক্ষ থেকে তাই কথা বলতে, দিনক্ষণ ঠিক করে পৌঁছে যাই প্রিন্স অব ওয়েলস্ হাসপাতালের চারতলায় অবস্থিত আট নম্বর বেডে, দীপায়নের পাশে।
খুব একা মনে হয়েছে দীপায়নকে। দুষ্টক্ষতের রেখা গুলো শরীরের বিভিনড়ব অংশে দৃশ্যমান। একটু আধটু কথা বলতে পারে। তবে দীর্ঘক্ষণ কথা বললেই কষ্টগুলো বাড়তে থাকে। সংক্ষেপে দীপায়নের সাথে কিছু কথা সেরে ফেললাম। এমনকি ওর জন্য আমাদের সামপ্রতিক অর্থসংগ্রহের অনুষ্ঠানের অনুমতিটাও। একটু পরে আসা বিধান এর সাথে পরিচয় হলো। প্রবাস জীবনে দীপায়নের একমাত্র পারিবারিক বন্ধু। বিধান আর দীপায়নের সাথে কথা বলে মনে হলো ডাক্তার দীপায়নের ব্যাপারে খুব আশাবাদী নন। সেদিনের মতো বিদায় নিলাম সঙ্গী প্রভাংসুর সাথে। বাংলা একাডেমী অস্ট্রেলিয়ার একজন একনিষ্ঠ কর্মী। প্রবাস জীবনে এরকম অনেকেই আছেন যারা নিজের খেয়ে অন্যের উপকারে ব্রত। শামীম আল নোমান এর লেখা পড়েছিলাম দীপায়নের ওপর। তখন থেকেই প্রথম জানতে পারি দীপায়নের অসুস্থ্যতার কথা। এরকম অনেকের কথাই বলতে ইচ্ছে করে। সময় সুযোগ হলে তা বলা যাবে। তবে আজ যাদের কথা না বললেই নয় তাদের মধ্যে মনে পড়ছে তিনটি নাম। মইনুল, উজ্জ্বল আর মিহির। সাদামাটা ব্যবসায়ী মইনুল। পড়ালেখার পাশাপাশি রেষ্টুরেন্ট ব্যবসায়ে রত। সংগীতে প্রতিভাদীপ্ত উজ্জ্বল আর মিহির। নিজেদের সঙ্গীতের দল তিলক কমোদ নিয়ে গত বছর থেকে কাজ করছে সিডনী শহরে। বাংলা একাডেমী অস্ট্রেলিয়ার সাথে এ আয়োজনের যৌথ আয়োজক। উজ্জ্বল প্রথম বাংলা একাডেমী অস্ট্রেলিয়াকে অনুরোধ করে বন্ধু দীপায়নের সাহায্যে এগিয়ে আসার জন্য। দুঃসহ জীবনের জন্য মইনুল হক প্রথম পর্যায়ে সংগৃহীত ৪০০ ডলার দেন। খুব দ্রত সিদ্ধান্ত নিয়ে কাজ আরম্ভ করি।
’মানুষ মানুষের জন্য’ শিরোনামে গত ১১ই আগষ্ট ২০০৭ এ পরিবেশিত হয় একটি অনুষ্ঠান। সিডনীর অনেক মানুষ এগিয়ে আসেন সাহায্যের হাত বাড়িয়ে। সংগীত পর্বে অংশ গ্রহণ করেন সিরাজুস সালেকিন, কাকলি মুখার্জী, উজ্জ্বল, বাপ্পি, জিয়া ইসলাম, রাজিত, মিহির, ফারজানা শারমিন, বিল্লু সহ অনেকেই। অনুষ্ঠানটির উপস্থাপনায় ছিলেন সায়েবা জালাল মুনা। সিডনীর বঙ্গমার্ট গ্রোসারিজ এর কর্ণধার আশরাফুল ইসলাম, সিডনী বিশ্ববিদ্যালয়ের ডঃ ফজলুল হক এর সংগ্রহ, মইনুল হক, উজ্জ্বল ও মিহির এর ব্যক্তিগত সংগ্রহ এবং বাংলা একাডেমী অস্ট্রেলিয়ার ডঃ হাসান শাহেদ সফি, রিজওয়ানা আলী, ডঃ রেজা আলী, নাজনীন হায়দার ও আনোয়ার আকাশ এর সংগ্রহ মিলে এবং টিকেট বিক্রয় লব্ধ অর্থ সহ মোট ৪,৬৩৮.২০ (চার হাজার ছয়’শ আটত্রিশ ডলার এবং কুড়ি সেন্ট) অর্থ সংগৃহীত হয়। সহযোগিতার বিশ্বস্ত হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন ইনামুল কবির সুদান, ফেহমিন ফরাসউদ্দিন সফি, এস এম সাজ্জাদ, আজিম বাবু, রুবাইয়াত করিম, শেরতাজ, গোলাম মোস্তফা, ডাঃ ডরিস, পিয়াল, টুকটুকি, মৌসুমী, মুসফিকা ইম্মি, ডঃ কাইউম পারভেজ, নুরুল আলম ফরিদ, হারুন রশীদ আজাদ, মিজান, ইয়ামিন, নাসির, মুনীর হাসনাইন, মাহমুদ সফি সহ সিডনীর সকল মিডিয়া। সংগীত সন্ধ্যার পর্বটি সমন্বয় করেন একাডেমীর শিক্ষক রিজওয়ানা আলী ও নাজনীন হায়দার।
’জীবনের কিছু স্বপড়ব আর মৃত্যুর হাতছানি; এই মরীচিকার মাঝে অসহায় একটি নাম দীপায়ন; যে বুকে হাত রেখে বলতে পারে না, আগামী দিনের সূর্য আর পাখীর ডাকে তার ঘুম ভাঙবে কিনা। মুখে অনাবিল হাসির আড়ালে লুকিয়ে আছে ক্যান্সার-দুষ্ট দেহ-ঘরের ধীরে ধীরে ক্ষয়ে পড়ার ভয়াবহ আভাস’। আমাদের শুভকামনা দীপায়নের জন্য। দীপায়ন সুস্থ্য হয়ে উঠুক। দীপায়নের জীবনে নেমে আসুক সুন্দরের ঝর্ণাধারা।
আনোয়ার আকাশ
উত্সঃ বাংলা-সিডনি.কম
Evergreen Bangla Community


Post Your Comments